প্রথম অনুভূতির প্রথম চুম্বন

আহম্মেদ মুন্নী
আমি তখন বড় হচ্ছিলাম প্রতিদিন। তাপ আর গন্ধ আবিষ্কারের নেশা আমাকে তাড়া করতো সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা রাইত ।

গ্রাম্য মাইয়া আমি
গ্রামীন জীবন আমার।
আহা শৈশব!
আহা শিশুকাল!

মাঝে মধ্যে সেইসব নবান্নে উৎসব আসত আমার জীবনে। ভোরবেলায় নানী, বড় আম্মাধান সিদ্ধ করত, আমাকে চুলার পাশে বসিয়ে দিত খড় দিতে লতাপাতা দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে রাখতে।

আমরা অবশ্য চুলাকে আখা বলতাম আর খড় লতাপাতাকে বলতাম খড়ি।

সেইসব শিশুকালে আমি আখায় খড়ি দিতে দিতে
তাপ আর গন্ধ আবিষ্কারে মেতে যেতাম নবান্নের প্রথম ধানসিদ্ধ পার্বণে।

হাঁড়ি ভর্তি ধান সিদ্ধ হত, ধোঁয়ার মত বাতাস উঠত।
তপ্ত বাতাস!
আহা তাপ উৎগারী বাতাস!

আমি নাক মুখ চুবিয়ে গরম বাষ্প অনুভবের চেষ্টা করতাম মাটির পাতিলে সিদ্ধ হওয়া ধানের।

সিদ্ধ ধানের তপ্তবাতাসে নবান্নের ঘ্রানে আমার নেশা ধরত সেই শৈশবেই।

আমার নাসারন্ধ্র শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে, তারা আবিষ্কারে মেতে উঠে নতুন নতুন ঘ্রানে।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার মুখের উপর ছড়ানো বিলিয়ন বিলিয়ন তাপ সেন্সর শক্তিশালী হয়ে উঠে নিত্য নতুন তাপে,
জলজ তাপে। ভাপে।

আহা ভাপ!
ধান সিদ্ধের সেইসব পার্বণেই আমার তাপসেন্সরগুলো নেশাতুর হত ভাপে, জলজ তাপে।
সেই নেশা আজও কাটেনি আমার।

চোখ মুখ নাসারন্ধ্রের মতই আঙুলগুলোও নেশাগ্রস্থ হতে চাইতো। আমার মত আমার আঙুলগুলো কৌতুহলী শিশুকাল থেকেই।

কল্পনাতেই সিদ্ধ ধানের হাঁড়িতে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখতাম, ধানভেদ করে চলে যেত আরো ভেতরে বাড়তে থাকত তাপ।

আমার আঙুল পুড়ে পুড়ে যেত তাপে, ভাপে। সেই তাপে নবান্নের প্রথম ধানের ভাপে নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে আমার আঙুলেরা।

আমি বড় হতে থাকি, তাপাশ্রয়ী স্নায়ুরা ছড়িয়ে পড়তে থাকে শইলে শইলে।

তারপর একদিন
বহুদিন পর এক সন্ধ্যা রাইতে।
আমার কোমল হাতের নরম আঙুল ধরে এক যৌবনে ভরপুর টকবগে যুবক।

বহুদিনের উপবাসে থাকা গ্রাম্য রমণী আমি
সদ্য কৈশোর পেরোনো তাপে কাতর, ঘ্রানে পাগল আমি।

ছাদবিহীন সেই গ্রাম্য ঘরে খড়ের বিছানায় লুটোপুটিতে মাতে সান্ধ্যকালীন চাঁদ।

কোমড় ঝাপটে যুবকের ধরে হিংস্রভাবে টান মেরে
আমি মরে মরে যাই তার শইলের তাপে পুড়ে।

রাজ্যবীহিন রাজার রাজদণ্ড চেপে ধরে প্রবল আক্রোশে আবারও
আমি মরে মরে যাই।

তার শইল হতে থেকে থেকে তাপ বেরোয়, প্রবল তাপ।

জেগে ওঠে আমার তাপাশ্রয়ী শইল,কাপতে থাকে আমার কৈশোরী ঝেড়ে বারন্ত রমনী শইল আর তাপকাতর রাজদণ্ড।

বিদ্রোহ করে যুবকের মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের বিরুদ্ধে, প্রবল আক্রশে গর্জে উঠে।

আমি আবিষ্কার করি এই শইল আমার না, আমার বড্ড অচেনা। আমি শুধু টের পাই আমার শইলজুড়ে কামাতুর মুষ্ঠিবদ্ধ হাত ।

তারপর কেটে গেল কত
দিন রাইত
অমাবস্যা পূর্ণিমা
পাহাড় উপত্যকা
জলজ-স্থলজ শৈল, গিরিখাত।

নবান্নের প্রথম সিদ্ধ ধানের
মতো তাপ-তাপ
ভাপ-ভাপ, ত্রিবেণীর ঘাট;
খুঁজে পাইনি শইল আমার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *