মতামত-বিশ্লেষণ

ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদ নমিনেশনে আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক সমীকরণ

আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ্: ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন/ডিএসসিসিতে পুরান ঢাকা অবস্থিত। এই পুরান ঢাকা হচ্ছে আজকের মেগাসিটি ঢাকার জন্মস্থান এবং ঢাকার মূল স্থানীয় আদিবাসী ঢাকাইয়াদের আবাসভূমি। অবিভক্ত ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মাদ হানিফের ছেলে মোহাম্মাদ সাইদ খোকন দ্বিখন্ডিত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র। মেয়র হানিফ পরিবারের সন্তান হিসাবে সাইদ খোকন পুরান ঢাকার বণেদী পরিবার ঘরানার সন্তান। তাকে ঢাকাইয়া তারুণ্যের আইকন বলা যায়। পোষাক-পরিচ্ছদ, অভিরুচি, অভিব্যক্তিতে তিনি অত্যন্ত স্টাইলিস, বিনয়ী, ঠান্ডা মাথার মানুষ। তারা আমাদের ঢাকাইয়াদের গর্ব।

পুরান ঢাকার উন্নয়ন ও আধুনিকরণের বিশাল চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি ডিএসসিসির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করলেও মাত্র এক মেয়াদের সময়ের স্বল্পতা হেতু সকল ক্ষেত্র এবং কাজে সাফল্য লাভ করতে পারেন নি। তবে তিনি বিভিন্ন ফ্লাইওভারের নিচে এবং এলাকায় গার্বেজ গোডাউন নির্মাণ করায় ঢাকা দক্ষিণের রাস্তার মোড়ে, অলিতে গলিতে ময়লার ভাগারের দুর্গন্ধের যন্ত্রণা থেকে দক্ষিণ ঢাকাবাসী অনেকটাই রেহাই পেয়েছে। তিনি ঈদুল আজহার সময়ে কোরবানীর হাট এবং পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা করেছেন। ঢাকা দক্ষিণের সকল রাজপথ, গলিপথকে এলইডি লাইট দ্বারা আলোকিত করেছেন এবং এগুলো নষ্ট হলে তা দ্রুত লাগিয়ে দেয়ার ব্যবস্থাও করেছেন। পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পুরানো, জীর্ণ, পরিত্যক্ত মাঠ এবং পার্কগুলোর নির্মাণ, সংস্কার, আধুনিকরণ করেছেন।

তিনি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-নরসিংদী রুটে নিয়মিত এবং পলাশী-ধানমন্ডি রোডে চক্রাকার এসি বাস সার্ভিস চালু করার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি বুড়িগঙ্গায় অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছেন, হোল্ডিং ট্যাক্স প্রদানকারীদের বাসাবাড়িতে সিটি কর্পোরেশন থেকে হোল্ডিং নাম্বারের নেইম প্লেট দেয়ার এবং সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক সংস্কার, উন্নয়ন কর্মকান্ডকে আরো গতিশীল করতে মেয়র এম্বাসিডোর নিয়োগ করার উদ্যেগ নিয়েছেন। ঢাকা দক্ষিণে সুপেয় পানি সরবরাহ করার এবং ড্রেনেস সিস্টেম আধুনিকভাবে গড়ে তোলার কার্যক্রম চলছে। এভাবে মেয়র সাইদ খোকন তার মেয়র থাকাকালীণ সময়ে ডিএসসিসির উন্নয়ন, সংস্কার কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করার এবং ডিএসসিসিকে আরো উন্নত, আধুনিক করার আন্তরিক চেষ্টা করেছেন।

তবে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির সময়ে তার সব সিদ্ধান্ত, নীতি, ভাল কাজ সব সময় ভাল, কার্যকর হয় না এবং সব কাজ একসাথে বাস্তবায়ন করাও সম্ভবপর না। যেমন, সাইদ খোকন ডিএসসিসির মেয়র নির্বাচিত হবার পর প্রথমে ঢাকা দক্ষিণের রাস্তা-গলি, ফুটপাত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে ঢাকা দক্ষিণের সকল রাস্তা ও ফুটপাতে বক্স ডাসবিন স্থাপন করলে তা অধিকাংশ চুরি হয়ে যায় এবং এতে তার একটি ভাল উদ্যেগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তবে ২০১৯ সালের দিকে ডিএসসিসিতে এডিস মশার জন্মবিস্ফোরণ, ব্যাপক উপদ্রব, ডেঙ্গু জ্বরের মহামারী এবং জন আতংক মেয়র সাইদ খোকনের অনেক ভাল ধারাবাহিক উন্নয়ন, সংস্কার উদ্যেগ, কার্যক্রম এবং সাফল্যকে ম্লান করে দিয়েছে। যদিও তিনি এডিস মশার ব্যাপক জন্মরোধ, কামড়, ডেঙ্গুর মহামারী থেকে ঢাকা দক্ষিণের নগরবাসীকে রক্ষা কল্পে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারনা, পোস্টারিং, মশক নিধনের পাশাপাশি হোল্ডিং টেক্সের রশিদ দেখিয়ে প্রতিটি বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের এরোসল দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

একইভাবে তার সময়কালে পুরান ঢাকার ভাঙাচূড়া রাস্তায় যাতায়াতের দুর্ভোগ কমানোর, নিত্যদিনের যানজট নিরসনের এবং বাসাবাড়ি, মার্কেটগুলো থেকে ক্যামিকেলের দোকান, গোডাউন সরানোর কার্যকর কোন পদক্ষেপ দক্ষিণ ঢাকাবাসী দেখতে পায়নি। হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধিকেও কেউ ভাল নজরে নেয়নি। তাই নানাবিদ রাজনৈতিক সমীকরণে সাইদ খোকন ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের হাইকমান্ড থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে নমিনেশান পাননি। পেয়েছেন শেখ পরিবারের সন্তান, শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে ঢাকা-১০ আসনের এমপি, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। বাহুত বাহুত মোবারাকবাদ উনকো। ব্যক্তিগতভাবে তিনি অত্যন্ত ক্লিন ইমেজের পলিটিক্যাল পার্সোনালিটি, স্মার্ট, ফ্যাশান সচেতন, মার্জিত এবং তারুণ্যের আইকন।

রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষের উত্থান-পতন, আসা-যাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ কোন পদ ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী না। তাই পূর্বসূরির অবদানকে স্বীকার এবং মূল্যায়ন করেই উত্তরসূরীর পথ চলা উচিত।
ডিএসসিসির মেয়র হিসাবে প্রথমবারের মত নির্বাচিত হলে মিস্টার তাপসের সামনে নতুন এবং বিশাল চ্যালেঞ্জ আছে। কারণ ঢাকা উত্তরের চেয়ে ঢাকা দক্ষিণের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, জনসংখ্যা সমস্যা ব্যাপক বহুমুখী এবং জটিল প্রকৃতির। তাই তার উচিত হবে পূর্বসূরীদের ভাল, সফল, প্রশংসিত, জনপ্রিয়, খারাপ, সমালোচিত, নিন্দিত, ব্যর্থ ব্যাপার, বিষয়, কাজগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা করা। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যকে অক্ষুন্ন রেখে তাদের গৃহীত বিভিন্ন জনপ্রিয়, সফল, চলমান উদ্যেগ, সংস্কার, উন্নয়নমূলক, জনকল্যাণকর কর্মকান্ডকে এগিয়ে নিয়ে, সমাপ্ত করে পুরান ঢাকাকে উন্নত, আধুনিক মেগাসিটি হিসাবে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা।

ডিএসসিসির নবনির্বাচিত মেয়র মহোদয় আন্তরিক, কঠোর হলে ডিএসসিসির বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সংস্কার খরচ অনেক কমিয়ে এনে সেগুলো দ্রুত, ভালভাবে নির্মাণ, আধুনিকরণ করা সম্ভব। এছাড়া তিনি একটি মাস্টার প্লানের ভিত্তিতে ওয়াসা, ডেসা, তিতাস, ফায়ার সার্ভিস প্রভৃতি স্বায়ত্ত্বশাসিত সরকারী প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার ব্যবস্থা করলে ভাল করবেন। পুরান ঢাকার ভাঙাচুড়া রাস্তা, গলিগুলো দ্রুত মেরামত করার, সব স্থানে ম্যানহল বসানোর, বুড়িগঙ্গা নদীকে অবৈধ দখল মুক্ত, ড্রেনেজ, সংস্কার, বিনোদনমুখী করার এবং প্রাচীন পুরানো ভবন, স্থাপত্যগুলো অক্ষুন্ন রেখে অধিগ্রহন, সংস্কার, ব্যবহার উপযোগী লাভজনক সেক্টর হিসাবে গড়ে তুললে তিনি দক্ষিণ ঢাকাবাসীর মন জয় করতে সক্ষম হবেন। জয়বাংলা।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

Close