সাহিত্য

জীবন যান্ত্রনার আরেক নাম !

ইমতিয়াজ আহমেদ: আমার একাডেমিক এক পরিক্ষা দিতে গিয়েছিলাম কলেজে, প্রশ্ন কমন পড়ে নাই তাই বানিয়ে বানিয়ে লিখেছি প্রশ্নের উত্তর পত্রে। পরিক্ষাটা শেষে করে ফিরছিলাম যখন, তখন বেলা মধ্য দুপুর। ফুটপাত ধরে হাটতে হাটতে রাস্তার দু-ধারের বিলবোর্ডের লেখা, প্রতিষ্ঠানের নাম, এমনকি অভিজাত বাসা-বাড়ির নেমপ্লেট পড়ার অভ্যেস সেই ছোট থেকে আমার।

তেমনি রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা- মোহাম্মদপুর সেন্ট যোসেফ স্কুলের সামনে অাতেই দেখি ভাম্রমান সাইকেল রিকশা মেরামতের দোকানে কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে অাসন পেতে বসে আছে একটি ছেলে, চুপচাপ মনমরা হয়ে বসে আছে সে ।

একটু পড়েই একটা রিকশা এসে ভিরতেই নাট বল্টু টাইট দেয়াসহ, চাঁকার বিয়ারিংয়ে মনোযোগ লাগিয়ে মবিল দিতে লাগালো ছেলেটি ।
এর পর একটা বাইসাইকেল এলো, চাঁকার পাম শেষ.. ছোট্ট ছেলেটি হার হৃদপিন্ডের সর্বোচ্চ শ্বাস প্রশ্বাস খালি করে পাম্পার (চাঁকায় হাওয়া দেওয়ার মেশিন) দিয়ে মুহূর্তে চাঁকাটা ভরে দিলো হাওয়ায় ।

এমন ছোট ছোট সাইকেল রিকশা মেরামত করে মজুরী ৫-১০ কিংবা কখনো ২০ টাকা, দিনশেষে যা পায় তাই দিয়ে চলে ছোট্ট মিস্ত্রী পারভেজ(৮) মিয়ার সংসার।

বাবা মারা গেছে সেই শিশুকালে, পরিবারে ৩ বোন অার একমাত্র পারভেজ। সংগ্রামী মা তার হাড় ভাঙা পরিশ্রম করে পারভেজের বোনদের দিয়েছে বিয়ে। মোহাম্মদপুর টাউনহল বস্তিতে বৃদ্ধ মায়ের সঙে থাকে পারভেজ, এই দোকানটাও তার মা চালায়, সাইকেল রিকশা মেরামতের কাজ পারভেজ শিখেছে নাকি মার কাছ থেকেই।

এখানেই শেষ না, সেন্ট যোসেফ লিটারেট স্কুলে এ বছর ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হয়েছে পারভেজ, সেখানে পড়তে কোন টাকা পয়সা দিতে হয় না পারভেজ কে। স্কুল শেষে মার সাথে রোজ সন্ধা অব্দী কাজ করে, অাজ স্কুল বন্ধ থাকায় মাকে অাসতে দেয়নি সে ; নীজেই সকাল থেকে দোকানে কাজ করছে তাই ।

পারভেজের দোকানে নিয়মিত রিকশা মেরামত করা মহাম্মপুরের রিকশা চালক কাশেম আলী বলেন, পোলাডা খুব ভালা, রিকশার ছোট খাটো কাম ওরে দিয়া করাই, অর মায়েও ভালা রিকশা ঠিক করে। খুব কষ্ট করে মা পোলা মিলা…

বড় হয়ে কি হবার ইচ্ছে, সরলভাবেই জানতে চেয়েছি তারকাছে। মুচকি হেসে পারভেজ জবাব দিলো, কিছু দূর লেহাপড়া কইরা গাড়ি চালান শিকমু, পাইবেটকার চালাইয়া টেকা জমামু, একটা ঘর দিমু গেরামে। মারে লইয়া গেরামে যামুগা।
দুপুরে কিছু খেয়েছো?
না; মায় খাওয়ন অানবো দুফুরে।

বেশকিছুক্ষন পারভেজের পাশে বসেছিলাম চুপচাপ ,কিন্তু তখনো তার মা এসে পৌঁছায় নি খাবার নিয়ে। একটা বিঅারটিসি বাস অাসতেই চেপে উঠলাম বাসটাতে আমি , পারভেজ আমারদিকে ঠায় তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন , নিশ্চই ওর চোখ চলমল করছিলো ক্ষুধার তাড়নায়.. মনে মনে ভাবলাম এভাবেও বেঁচে আছে কেউ কেউ, হয়ত ভালোই আছে, হয়ত জীবনের সংঙ্গা বলতে ছোট্ট পারভেজের কাছে কেবলি যন্ত্রণার আরেক নাম ।।

লেখা ও ছবি : ইমতিয়াজ আহমেদ।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *