ঘষেটি বেগম ইতিহাসের খলনায়িকা

এস.এম.নাহিদ, বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : সেই পলাশী প্রান্তর, নবাব সিরাজদ্দৌলা, মীর জাফর, মিরন, ঘষেটি বেগম, বিশ্বাসঘাতকতা শব্দটিকে যারা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বেশ ভালভাবেই। তবে তাদেরও অনেকের মৃত্যু হয়েছিল বিশ্বাসঘাতকতার কারনেই। কি করুন নিয়তি সেদিন বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার। নবাবের ভাগ্যের আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা, তাও নবাব সিরাজদ্দৌলার খালা ঘষেটি বেগমের পরিণতির কথা।ঘষেটি বেগম একজন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে সিরাজদ্দৌলার হাতে যেমন ধরা পড়েছিলেন তারই অনুগত মীর নজর আলীর বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে, তেমনই তার মৃত্যুও হয়েছিল আরেকজনের বিশ্বাসঘাতকতার ফলেই। বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের ছেলে মিরন চাইছিলেন নবাব আলিবর্দীর সর্বশেষ জীবিত দুই তনয়া ঘষেটি বেগম ও আমেনা বেগমকে (সিরাজদ্দৌলার মা) দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতে। এজন্য তিনি দুজন লোক পাঠিয়েছিলেন ঢাকার নায়েবে আমির জেসারত খাঁর উদ্দেশ্যে, যাতে করে তিনি এ বিষয়ে একটি ব্যবস্থা নেন। কিন্তু জেসারত খাঁর আবার নবাব আলিবর্দীর প্রতি ছিল কৃতজ্ঞতার সুদীর্ঘ ইতিহাস। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ভারতবর্ষে আসলেও তেমন সুবিধা করতে না পেরে ভগ্নমনে রাস্তার পাশেই মাথা গোজার ঠাই করে নেন তিনি।শারীরিকভাবেও ছিলেন বেশ অসুস্থ। সেখান থেকে নবাব আলিবর্দী জেসারতকে নিজ প্রাসাদে এনে আশ্রয় দেন। চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তোলেন। নিজের কাছে রেখেই তাকে রাজকার্জ শেখাতে থাকেন। পরে নিজ গুণে কালক্রমে ঢাকার নায়েবে নাজিম হন জেসারত খাঁ। তাই আলিবর্দীর কোনো তনয়ার প্রতিই নির্মম হতে পারেননি তিনি। ফিরিয়ে দিলেন মিরনের দুই দূতকে। এতে করে মিরন বুঝে গেলেন যে, জেসারত খাঁ তার কিংবা তার বাবার মতো নেমকহারামি করার মানুষ না। তাই তিনি নতুন করে দায়িত্ব দিলেন তার বিশ্বস্ত অনুচর আসফ খাঁকে। মিশন সেই আগেরটাই- ঘষেটি ও আমেনা বেগমের বিশ্বাসভাজন হয়ে তাদের খতম করে দেয়া। অল্প সময়ের মাঝে দুই বোনেরই আস্থার পাত্র হয়ে যান আসফ। বিশেষ করে ঘষেটি বেগমকে তিনি বোঝাতে সক্ষম হন যে, আসলে তাকে নিতেই ঢাকায় এসেছেন আসফ। কারণ, সিরাজদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যূত করতে তার অবদানের কথা ভুলে যাননি মীর জাফর। তাই তাকে মুর্শিদাবাদে এনে সম্মানীত করতে চান তিনি। জাঁকজমকে পরিপূর্ণ মতিঝিল প্রাসাদ আবারও ঘষেটি বেগমের হাতে তুলে দিতে চান। ফলে মুর্শিদাবাদের ফিরে যেতে ঘষেটি বেগমের আর তর সইছিল না। ওদিকে আমেনা বেগমের রাজি হওয়ার কারণ ছিল ভিন্ন। তাকে বলা হয়েছিল, তিনি মুর্শিদাবাদের খোশবাগে পুত্র সিরাজের কবর জিয়ারতের অনুমতি পেয়েছেন। কবর জিয়ারত শেষে আবারও তাকে এখানে ফিরিয়ে দিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে সময়-সুযোগমতো একদিন দুই বোনকে রাতে এক বজরায়(রাজকীয় নৌকা) দুটো আলাদা রুমে তুলে দেয়া হয়। তাদের কেউই একে অপরের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতেন না। পাশে ছিল আরেকটি বজরা। গভীর রাতে দুই বোনের বজরা ছেড়ে মাঝিরা চলে গেলো অন্য বজরায়। কারণ দুই বোন যে বজরায় করে যাচ্ছিলো তা বানানো হয়েছিল বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে। এর নিচের দিকে কয়েকটি বড় ছিদ্র করে সেগুলো খিল দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। মাঝিরা অন্য নৌকায় যাওয়া মাত্রই আসফ খিলগুলো খুলে ফেলেন। ফলে নৌকায় খুব দ্রুত পানি ঢুকে যেতে শুরু করে। দু’বোন তখন বুঝতে পারেন যে তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। আমেনা বেগম প্রাণভিক্ষা চাননি। তিনি কেবল সৃষ্টিকর্তার কাছে মিরনের বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি চেয়ে দোয়া করেছিলেন। বলেছিলেন, হে আল্লাহ, তুমি মিরনের অপরাধী মস্তকের উপর বিনা মেঘে বজ্রপাত নিক্ষেপ করে বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কার দিও। ওদিকে ঘষেটি বেগম অনেক অনুনয়-বিনয় করেন, অতীত স্মরণ করিয়ে দিয়ে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে তিনিও মীর জাফর আর মিরনের পক্ষেরই লোক। বলছিলেন, মীর জাফর সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করায় ও সিরাজ তা জানতে পেরে পদচ্যুত করেছিল তাকে। ঐ দুঃসময়ে আমি মীর জাফরকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছি। মীর জাফরের কোনো ক্ষতি তো আমি করিনি। কিন্তু তার এসব আবেগপূর্ণ ও কান্নামাখা কথায় চিড়ে ভেজেনি। যাদেরকে তিনি এককালে রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বেশি আপন বলে মনে করেছিলেন, তাদেরই পাতা ফাঁদে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয় তাকে। অসহায়ভাবে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে বুড়িগঙ্গার পানিতে ডুবে নিজের বিশ্বাস ঘাতকতার পরিণাম ভোগ করলেন ঘষেটি বেগম। ঘষেটি বেগম,বিশ্বাসঘাতকতা যাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিয়ে গেল ওপারে।এমনকি কপালে কবরও জোটেনি ইতিহাসের এই খলনায়িকা ঘষেটি বেগমের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *