করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের সম্ভাব্য করণীয়

আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ্ঃ সারা বিশ্ব এখন চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া মরণ ঘাতী মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে চরমভাবে বিপর্যস্ত, আতংকগ্রস্থ এবং দিশেহারা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিদিন করোনা আক্রান্ত রোগী এবং মৃতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। করোনা ভাইরাসের আক্রমনে সারা বিশ্বের রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক, বাণিজ্যিক, পর্যটন, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং স্থল, জল, আকাশ, ভূ-গর্ভস্থ পথের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রায়। এক দেশ/মহাদেশ থেকে অন্য দেশ/মহাদেশে, এক প্রদেশ/অঞ্চল থেকে অন্য প্রদেশ/অঞ্চলে গমনাগমন বন্ধ/নিষিদ্ধ। অনেক রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক রাজধানী, প্রধান বাণিজ্যিক, পর্যটন নগরীগুলো লক ডাউন/অবরুদ্ধ হয়ে আছে বা কারফিউয়ের মধ্যে চলছে। মার্কিণ প্রশাসন এবং গবেষকরা আশংকা প্রকাশ করেছেন, করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে মানব জাতির এই প্রতিরোধ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। আর এতে নিশ্চিতভাবে আরো মানুষের মৃত্য অনিবার্য।
বিশেষ করে চীন, ইউরোপ, বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসী ফেরত ব্যক্তিদের অনেকে তাদের দেহে করোনা ভাইরাসকে বহন করে এনেছে। তাই তাদের সবাইকে ১৫ দিন করে বাধ্যতামূলকভাবে আইসোলন বা সেল্ফ কোয়ারান্টাইনে রেখে তাদের মধ্য থেকে করোনা আক্রান্ত রোগী সনাক্তকরণ এবং তাদের চিকিৎসা দেবার ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে। এ যাবৎ তাদের মধ্য থেকে বিভিন্ন দফায় ১৭ জন করোনা আক্রান্ত রোগীর খোজ পাওয়া গেছে। দেশের প্রখ্যাত প্রফেসর ডাঃ এ.বি.এম আব্দুল্লাহ দেশে প্রবাসী ফেরত ব্যক্তিদের মাধ্যমে করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঘটতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ সরকার এই প্রেক্ষিতে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রথমত সর্বপ্রকার ভিসা দেয়া বন্ধ রেখেছে। দ্বিতীয়ত করোনা আক্রান্ত দেশগুলো থেকে বিদেশী এবং প্রবাসীদের নিয়ে সর্বপ্রকার বিমানের আগমন এবং যাত্রীদের অবতরণ নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছে। তৃতীয়ত সাময়িক সময়ের জন্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করেছে এবং বন্ধ রেখেছে। সবার উর্ধবে দেশ এবং জাতির বৃহত্তর জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাবে এটাই সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা।
আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত ভিত্তিতে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের ব্যাপারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া এবং সর্বাত্নক প্রস্তুতি নেয়া। ১/ মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশিত আদেশ বলে প্রত্যেক বিদেশ ফেরত প্রবাসীকে কোয়ারাইন্টানে রাখতে এবং থাকতে হবে। ২/ করোনা সনাক্তকরণ কীটের দ্বারা প্রত্যেকে বিদেশ ফেরত প্রবাসী এবং তাদের পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে টেস্ট করে নিশ্চিত করতে হবে তাদের কারো শরীরে করোনা ভাইরাস আছে কিনা। ৩/ এছাড়া যেকোন ব্যক্তির শরীরে সন্দেহজনক ব্যাপার অনুভব এবং ধারনা করা মাত্র তাকে করোনা সনাক্তকরণ ল্যাবে আসতে, পরীক্ষা করাতে হবে তাদের নিজেদের এবং তাদের পরিবারকে নিজ দায়িত্ববোধ থেকে। ৪/ করোনা ভাইরাসের আক্রমনকে প্রাথমিকভাবে মোকাবেলার জন্য এবং করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য ঢাকার হাজী ক্যাম্পে, উত্তরার রাজউক এপার্টমেন্ট প্রকল্পে, টঙ্গীর বিশ্ব এজতেমা ময়দানে কোয়ারিন্টাইনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া কিছু সরকারী হাসপাতালে আলাদাভাবে কয়েক হাজার আসন শয্যা ব্যবস্থা করা।
৫/ সেনাবাহিনীর চিকিৎসক প্রতিনিধি দল চীনে পাঠিয়ে চীনের চিকিৎসক দলের কাছ থেকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ কৌশল, আক্রান্ত রোগীদের সেবা দান এবং সেবাদানকারীদের নিরাপদ রাখার বিষয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত বাস্তব শিক্ষা লাভ, প্রযুক্তি, কৌশল পদ্ধতি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা অর্জন, প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা; প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কৌশল প্রয়োগ পদ্ধতি শিখে আসা। ৩/ তাদের সাথে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ, নির্মূল সংক্রান্ত ব্যাপারে কথা বলা, উপদেশ, পরামর্শ নেয়া, মত বিনিময় করা, তাদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জেনে আসা। ৬/ করোনা ভাইরাস সনাক্তকরণের জন্য সেনাবাহিনীর মাধ্যমে দ্রুত ভিত্তিতে ল্যাব্রটারী মেশিনারীজ আমদানী এবং প্যাথোলজিকাল ল্যাব স্থাপন করা। ৭/ হাসপাতালের ডাক্তার, সার্জন, গবেষক, নার্স, স্টুয়ার্ড বয়, বুয়া, সরকারী কর্মকর্তা, রোগীদের জন্য দ্রুত ভিত্তিতে পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট, করোনা নির্ণয়ের কিট, ভেন্টিলেটর, ড্রেস, মাস্ক, হেন্ড গ্লাভস, সু, এন্টি সেপ্টিক সাবান, জীবাণুনাশক ঔষুধ, রোগীদের খাবার ঔষধ, ভেকসিন, স্যালাইন আমদানী করা এবং গুদাম জাত করার ব্যবস্থা করা।

৮/ চীন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা ব্যক্তিদের মাধ্যমে হাসপাতালের সাধারণ ডাক্তার, সার্জন, গবেষক, নার্স, স্টুয়ার্ড বয়, বুয়াদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ৯/ জনসাধারণের মধ্যে বিনামূল্যে মাস্ক, হেক্সিসল, হেন্ড গ্লাভস, টিস্যু স্যানিটাইজার বিতরণের ব্যবস্থা করা। ১০/ মাঠ পর্যায়ে পরিবার ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সেবা কর্মীবাহিনী, এনজিও সংস্থা সমিতি, বিভিন্ন সরকারী- বেসরকারী মিডিয়া চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে করোনা ভাইরাস, তার প্রভাব, প্রসার, প্রতিকার সম্পর্কে ভালভাবে অবগত করা এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা। ১১/ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সার্বিক চিকিৎসা এবং তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। ১২/ করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি মারা গেলে তাকে তার ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী গোসল করিয়ে বিশেষ নিরাপদ প্যাকেটে সিলগালা করে তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। কেউ সেই লাশের প্যাকেট খুলতে পারবে না। শুধুমাত্র ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পন্ন করবে।
১৩/ দেশের অভ্যন্তরে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকারকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং অতি সত্ত্বর রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে লক ডাউন ঘোষনা কার্যকর করতে হবে। ১৪/ যেকোন জরুরী অবস্থায় দেশে খাদ্য-পণ্যের চালান সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার এবং কেউ যাতে মজুদ ব্যবসা করতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। ১৫/ সরকারী-বেসরকারী চাকুরীজীবীদের জন্য ঝুকি ভাতা নিশ্চিত করতে হবে এবং দরিদ্র- নিম্নবিত্তদের জন্য দুর্যোগকালীণ ওএসএম পদ্ধতি, রেশনিং ব্যবস্থা, ত্রান সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ১৬/ এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সামরিক বাহিনী, বিজিবি, র‍্যাব, পুলিশসহ সকল নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারের সকল প্রকার সংস্থা এবং সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানের সর্বাত্নক লজিস্টিক সাপোর্ট একান্ত অপরিহার্য। ১৭/ সরকার এবং সেনাবাহিনীর এই অপারেশান করোনা প্রজেক্টে দেশের ধনীক শ্রেণিকে উদাত্ত হস্তে আর্থিক সহযোগী করতে অনুপ্রাণিত করতে হবে। ১৮/ করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত উদ্ভূত দেশের জরুরী পরিস্থিতিতে সরকারকে দেশের সাধারণ মানুষের সার্বিক সহযোগীতা এবং সমর্থন নিতে হবে।
asifultasin18@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *