জাতীয়

আকাশ থেকেও তুমুল আক্রমণ

টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : ১৯৭১ সালের ৩, ৪ ও ৫ ডিসেম্বর যশোর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। এ সময় মিত্রবাহিনী সীমান্ত এলাকা থেকে যশোর সেনানিবাসসহ পাক আর্মিদের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালাতে থাকে। একপর্যায়ে পর্যদস্তু পাকবাহিনী ৫ ডিসেম্বর থেকে পলায়ন শুরু করে। যশোর সেনানিবাস থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে খুলনার গিলাতলা সেনানিবাসের দিকে পালাতে থাকে। পাকবাহিনী ৫ ও ৬ ডিসেম্বর পলায়নকালে রাজারহাটসহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে তাদের প্রচণ্ড লড়াই হয়। ৬ ডিসেম্বর বিকালের আগে যশোর সেনানিবাস খালি করে পালিয়ে যায় পাক হানাদার বাহিনী। ওইদিন বিকালে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যশোর সেনানিবাসে প্রবেশ করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতীয় সীমান্তবর্তী যশোর জেলা ছিল পাক হানাদারদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। বীর মুক্তিযোদ্ধারাও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এ জেলাকে স্বাধীন করতে প্রাণপণ লড়াই শুরু করেছিলেন।
জীবন যখন মৃত্যুভয়হীন, তখন নেই কোনো সংশয়। বাঙালির তা ছিলও না কোনোদিন। ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর বাঙালি আবার তার অকুতোভয় চিত্তের জানান দেয়। মরতে যখন হবেই, তখন শত্রুকে কোনো দিক থেকেই ছাড় নয়। মুক্তিযোদ্ধারা স্থল ও জলপথের পাশাপাশি প্রচণ্ড আক্রমণ করেন আকাশপথেও। এদিন বাংলাদেশকে নিয়ে মার্কিন সরকারের বিশেষ উদ্যোগে জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন বসে।
উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয় ‘বাংলাদেশ’ ইস্যুতে। অন্যদিকে বেহাল অবস্থা দেখে ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ পুতুল শাসক গভর্নর ডা. মালিক দেশবাসীর কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। বাংলাদেশ ও ভারতীয় বিমানবাহিনী মূলত ৩ ডিসেম্বর রাত ১টায় বিমান হামলা শুরু করে। কিন্তু ৫ ডিসেম্বর সেটা বিধ্বংসী আকার ধারণ করে। বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর অধিকাংশ বিমান ধ্বংস করা হয়।
মিত্রবাহিনীর জঙ্গি বিমানগুলো সারা দিন আকাশে উড়ে পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটিগুলোয় প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়, অকেজো করে দেয় বিমানবন্দরগুলো। ভারতীয় বিমানবাহিনীর হিসাবমতে, ১২ ঘণ্টায় ২৩২ বার আক্রমণে ঢাকার তেজগাঁও ও কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে ৫০ টনের মতো বোমা ফেলা হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর ৯০টি গাড়ি ধ্বংস হয়। এ ছাড়া পাকিস্তানি বাহিনীর সৈন্যবোঝাই কয়েকটি লঞ্চ ও স্টিমার ধ্বংস হয়। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী সিলেট সেক্টরে বোমা ছোড়ে শত্রুর পাঁচটি বাংকার উড়িয়ে দেয়।
জামালপুরে বিমান হামলায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কয়েকশ সৈন্য নিহত হয়, বিধ্বস্ত হয় বহু সামরিক যানবাহন। এদিন চট্টগ্রামে পাকিস্তান নৌবাহিনী ও যৌথ নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজগুলোর মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়।বকশীগঞ্জে যৌথবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়। মুক্ত হয় পীরগঞ্জ, হাতিবান্ধা, পচাগড়, বোদা, ফুলবাড়ী, বীরগঞ্জ ও নবাবগঞ্জ। আর জীবননগর, দর্শনা ও কোটচাঁদপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মিত্রবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে টিকতে না পেরে আত্মসমর্পণ করে।বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনীর যৌথ কমান্ডের সফল আক্রমণে ধ্বংস হয় পাকিস্তানি সাবমেরিন ‘গাজী’। সাবমেরিনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তান ধার হিসেবে নিয়েছিল।
এদিকে স্থলেও মিত্রবাহিনী এগিয়ে যায় লড়াই করতে করতে। পাকিস্তানি বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দেন তারা। ভারতের ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশন আখাউড়ার যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী আখাউড়ার দক্ষিণ ও পশ্চিমাংশ দিয়ে অবরোধ করে। এখানে পাকিস্তানি বাহিনী যুদ্ধে টিকতে না পেরে আত্মসমর্পণ করে। ফলে আখাউড়া সম্পূর্ণ রূপে শত্রুমুক্ত হয়।
১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে পুনরায় যে অধিবেশন বসে তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের এক প্রস্তাবে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে এমন এক ‘রাজনৈতিক নিষ্পত্তি’ প্রয়োজন, যার ফলে বর্তমান সংঘর্ষের অবসান নিশ্চিতভাবেই ঘটবে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সহিংসতার দরুন পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটেছে, তা-ও অবলিম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন।
একমাত্র পোল্যান্ড প্রস্তাবটি সমর্থন করে। চীন ভোট দেয় বিপক্ষে। অন্য সব সদস্য ভোটদানে বিরত থাকে। ওইদিন আরো আটটি দেশের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদে আরো একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়।
এবার সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয়বার ভেটো প্রয়োগ করে। একই সময়ে এক বিবৃতিতে সোভিয়েত সরকার ‘পূর্ব বাংলার জনগণের আইনসংগত অধিকার ও স্বার্থের স্বীকৃতির ভিত্তিতে’ সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের দাবি জানায়। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে এ উত্তপ্ত অবস্থায় যাতে মুক্তিযোদ্ধারা মনোবল হারিয়ে না ফেলেন, সে জন্য মুক্তিবাহিনীর সেনাপতি জেনারেল ওসমানী জাতির উদ্দেশে বেতারে ভাষণ দেন।

অন্যদিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শাসক গভর্নর ডা. মালিক দেশবাসীর কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে বলেন, দেশ আক্রান্ত। ভারতীয়দের সহযোগিতায় কিছু বিশ্বাসঘাতক দেশ আক্রমণ করেছে।
এ দেশের সেনাবাহিনী তাদের প্রতিরোধ করছে। তাদের সাহায্য করার জন্য প্রতিরক্ষা তহবিল করা হয়েছে। সে তহবিলে মুক্তহস্তে সাহায্য করার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান। কিন্তু প্রকৃত সত্য অনুধাবন করতে পেরে এমন ডাকে কোনো সাড়া আসেনি।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *