লকডাউন-কোয়ারেন্টিনে প্রবাসী নাগরিক, বাড়ির পুরুষ-নারীদের করণীয় এবং শিক্ষণীয়

আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ্ঃ যুগের সাথে পৃথিবী অনেক এগিয়েছে, পরিবর্তন হয়েছে এবং হচ্ছে। নারীরা আজ সংসার, রান্নাঘর সামলেও রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা, আকাশে বিমান চালনা এবং রণাঙ্গণে সৈনিকের কাজ করছেন। অপরদিকে পুরুষরাও পরিবার-রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে হোটেল-রেস্টুরেন্টের সেফ, মেয়েদের কাপড়-অন্তর্বাসের ফ্যাশান ডিজাইনার, মেকাপ আর্টিস্ট হয়ে বিশ্বখ্যাতি অর্জন করছেন। তাই ঘর-সংসারের সব কাজ কেবল নারীর এবং বাইরের সব কাজ কেবল পুরুষের এই ধরনের চিন্তাচেতনা মান্ধাতা আমলের; যা আজকের ডিজিটাল যুগে হাস্যকর, অচল।

করোনা ভাইরাস মহামারীকে কেন্দ্র করে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও লকডাউন এবং কোয়ারেন্টিন চলছে। ফেব্রুয়ারী ২০২০ থেকে এ পর্যন্ত দেশে ফেরত আসা প্রত্যেক প্রবাসী নাগরিকের উচিত নিজের পরিবার, এলাকা এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে নিজ দায়িত্ববোধ থেকে নিষ্ঠার সাথে হোমকোয়ারেন্টিন পালন করা। সরকার থেকে তাদের উপর কঠোরভাবে নজরদারির ব্যবস্থা করা। বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে তাদের সবার নাম ও ঠিকানার লিস্ট ধরে সন্দেহভাজনদের দ্রুত করোনা পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করা। অপরদিকে কর্মমুখর খেটে উপার্জন করা পরিবারের পুরুষরা এখন সুবোধ বালকের ন্যায় সারাক্ষণ ঘরেই অবসর অলস সময় কাটাচ্ছে, খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে, ঝিমাচ্ছে, টিভি দেখছে, নেট চালাচ্ছে। অনেকে নিজের, বাসার কাজ নিজে কিংবা স্ত্রীর সাংসারিক, রান্নার কাজে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগীতা করছে; ছেলেমেয়েদের সাথে খেলছে।

আর এই লকডাউন এবং কোয়ারেন্টিনের দিনগুলোতে পুরুষদের উচিত প্রকৃত পৌরুষত্বকে প্রমাণ করার। সারা দিন খবরের কাগজ পড়া, খাওয়া, ঘুমানো, ফেসবুক চালানো, নেট এবং স্যাটালাইট চ্যানেলের নিউজ, গেমস দেখা/খেলার পাশাপাশি প্রতিদিন একটু সময় করে নিজের মা-বাবা, বোন-ভাই, বৌ, ছেলেমেয়ে, বাসার এবং বাবা-মার পরিবারের মুরুব্বিদের জন্য সময় বের করুন। তাদের কাছে গিয়ে, পাশে গিয়ে বসুন; তাদের সাথে কথা বলুন, শরীর-মনের খোজখবর নিন। কার কি ইচ্ছা বা প্রয়োজন জেনে নিন। পর্যায়ক্রমে নিজের সামর্থ্য এবং সাধ্যের মধ্যে তাদের স্বপ্ন, চাওয়া, প্রয়োজনগুলো পূরণ করার পরিকল্পনা করুন।

হোমকোয়ারেন্টিনের এই সময়টাকে যে কেউ চাইলে কর্মবহুল, আনন্দময়, রোমাঞ্চকর বানাতে পারে। পরিবারকে অধিক সময় দিতে পারে। বড়রা নিজেরা মিলে এবং বাসার ছোট ছেলেমেয়েদের সাথে লুডু, সাপ-সিড়ি, মনোপলি, দাবা, কেরাম খেলুন। মজাদার গল্প বা আলাপ করুন। বাসার ভেতরে ক্রিকেট খেলুন। ছাদে থেকে বেড়ায়ে আসুন। বারান্দা বা ছাদ বা উঠানে বাগান থাকলে তা পরিচর্যা করতে পারেন। বাসার অপ্রয়োজনীয় জিনিস, কাগজপত্র আলাদা, পরিষ্কার করতে এবং ফেলে দিতে পারেন। নিজের ড্র‍য়ার, আলমারীর সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখুন এবং অপ্রয়োজনীয় সবকিছু ফেলে ঘর, বাসা হালকা করুন।

মা, বোন, ভাবী, বৌকে কিচেনে রান্নার কাজে, টেবিলে খাবার-প্লেট-গ্লাস লাগাতে, খাবারের পর টেবিল পরিষ্কার করতে, ফ্রিজে ভরে গুছিয়ে রাখতে, বাসা-ঘরের কাপড়, এলোমেলো জিনিসপত্র ভাজ করে/গুছিয়ে রাখতে, ঝাড়পোছ, আসবাবপত্র, ইলেক্ট্রিক জিনিসপত্র পরিষ্কার করতে, প্লেট-গ্লাস-মগ; কাপ-পিরিজ ধুইতে সহায়তা করুন। এই সময়কালে বাসার ছোট-বড় ছেলেমেয়েদের সাথে নিয়ে তাদের বয়স, বুদ্ধি, শক্তি অনুপাতে বাসার বিভিন্ন কাজে অভ্যস্ত করান এবং শিখান। এতে তাদের একটা বেসিক ট্রেনিং হয়ে যাবে এবং পরবর্তীকালে এটা তাদের জীবনে অনেক কাজে আসবে। বাসায় রান্না করার নূন্যতম প্রয়োজনীয় কাঁচাবাজার, শুকনা খাবার, ঔষুধ, হেক্সিসন, মাস্ক-গ্লাভস আছে কিনা তা খেয়াল রাখুন এবং শেষ হয়ে গেলে নিজের সুরক্ষা বজায় রেখে সেগুলো লিস্ট করে নিয়ে আসুন।

করোনা সংকটকালে সবার বিলাসিতা পরিত্যাগ করে সব কিছু পরিমিতভাবে খাওয়া এবং কোনভাবে খাবারের অপচয় না করা। উল্টাপাল্টা, অতিরিক্ত, তেল জাতীয়, মশলাদার, ঝাল খাবার খেয়ে শরীর/পেট খারাপের ঝুঁকি না নেয়া। মহিলাদের উচিত বাসার সবার জন্য স্বাস্থ্যকর, পুষ্টিকর, হালকা জাতীয় খাবারের পদ রান্না করা। অধিক তেলদার, মশলাদার, ঝাল বা চর্বি জাতীয় নাস্তা, খাবার না বানানো। ঘন ঘন পোলাও, বিরিয়ানী, খিচুরীর মত খাবার খাওয়া পরিহার করে চলা। সর্বপ্রকার অতিরিক্ত ঢান্ডা জাতীয় পানীয় পান করা এবং খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকা যাতে সহজে কারো সর্দি-কাশি না লাগে, জ্বর না হয়। বাসাবাড়ি মুছতে, আসবাবপত্র, জিনিসপত্র ধুইতে ঢান্ডা পানির সাথে গরম পানি মিশিয়ে নিন।

এই সময় নিয়মিত বেশি বেশি পানি, লেবুর শরবত, জুস, মধু মিশ্রিত/শুধু গরম পানি, চা/কফি, দুধ পান করা উচিত। এসব সাবধানতার কারণ যাতে কেউ নিজে স্বেচ্ছায় নিজেকে অসুস্থ্য করার ঝুঁকি না নেয়/বানায় এবং পরিবারের অন্যদের জন্য অযথা কষ্টের কারণ না হন। আর সর্দি-কাশি, জ্বর হলে অযথা আতংকিত না হয়ে একটু লবন বা ১ চামচ ভেনিগার মিশ্রিত গরম পানি দিয়ে গলার ভেতর গরগরা করা, কাশির সিরাপ, এইস/নাপা খাওয়া। আর করোনা ভাইরাস সংক্রামণের সন্দেহ হওয়া মাত্র দ্রুত ভিত্তিতে করোনা টেস্ট করার ব্যবস্থা করা।

এ সময়ে পুরুষদের উচিত বাসার মা-স্ত্রীদের সাথে মনমালিণ্য, ঝগড়া, বিবাদ এড়িয়ে চলা। কারণ করোনা ভাইরাস সংকটকালীন সময়ে সারা দিন বাসার ভেতর আপনাদের থাকতে হবে, মা-স্ত্রীদের হাতের রান্না করা খাবারই খেতে হবে। বাসার বাইরে কোথাও চলে যাবার এবং হোটেল থেকে খেয়ে আসার নূন্যতম সুযোগ নেই। তবে করোনা মহামারী সংকট সারা বিশ্বের পুরুষ জাতিকে এটা শিক্ষা দিয়েছে যে, বাসা, এলাকা, রাষ্ট্রের যত বড় মাতাব্বর, জ্ঞানী, মাস্তান, পালোয়ান, বীর, সাহসী পুরুষ হন না কেন নিজের ঘর এবং পরিবারের সদস্যরাই হচ্ছে পুরুষের একমাত্র প্রকৃত আশ্রয়স্থল এবং বিশ্বস্ত আপনজন।

তাই সমাজের সব খিটখিটে/বদমেজাজী, উদ্ধত/অসভ্য প্রকৃতির, খারাপ চরিত্রের, মদখোর/মাদকাশক্ত পুরুষদের উচিত করোনা মহামারীর বিপদ-দুর্ভোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে ভাল মানুষ হবার, পরিবারের সদস্যদের প্র‍তি সহানুভূতিশীল এবং স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি ভালবাসা প্রবণ হবার। আর কর্মজীবী/গৃহিণী নারীদের উচিত নিজের পরিবার, বংশ, পদ, পদবী, অর্থ, ক্ষমতার বড়াই না করে ঘরে
-বাইরে, কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের সাথে মিলেমিশে চলার চেষ্টা করা এবং লকডাউন, কোয়ারেন্টিনের দিনগুলো আনন্দময়, রোমাঞ্চকর এবং রোমান্টিক স্মৃতিময় বানানো। নিজেদের সুরক্ষা বজায় রেখে এলাকার বিপদাপন্ন, অসহায়, অস্বচ্ছল এবং দরিদ্র মানুষদের সাধ্যমত সাহায্য- সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। অল্প খেয়ে, অল্প পরে, বিলাসিতা ত্যাগ করে সবাই মিলেমিশে থাকা এবং সামনের দিকে এগিয়ে চলা।
asifultasin18@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *