মে মাসের দ্বিতীয় রোববার “মা” দিবস

জিয়াউদ্দীন চৌধুরী (জেড সেলিম), বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: মা’–ছোট্ট একটা শব্দ, কিন্তু কি বিশাল তার পরিধি! সৃষ্টির সেই আদিলগ্ন থেকে মধুর এই শব্দটা শুধু মমতার নয়, ক্ষমতারও যেন সর্বোচ্চ আধার৷ মার অনুগ্রহ ছাড়া কোনো প্রাণীরই প্রাণ ধারণ করা সম্ভব নয়৷ তিনি আমাদের গর্ভধারিনী, জননী৷ জন্মদাত্রী হিসেবে আমার, আপনার, সকলের জীবনে মায়ের স্থান সবার ওপরে৷ তাই তাঁকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানানোর জন্য একটি বিশেষ দিনের হয়ত কোনো প্রয়োজন নেই৷ তারপরও আধুনিক বিশ্বে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারটিকে ‘মা দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে, যার সূত্রপাত ১৯১৪ সালের ৮ই মে থেকে৷ মাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে এ দিনটিকে মা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। সাধারণত মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে মা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
মা দিবসের ইতিহাসে জানা যায়, মা দিবসের আনুষ্ঠানিকতার ইতিহাস যেমন প্রাচীন তেমনি চমকপ্রদ। মা দিবসের পেছনের ইতিহাস খুঁজতে গেলে গ্রিক ও রোমানদের ইতিহাসে ফিরে যেতে হয়। প্রাচীনকালে মাতৃদেবীদের উদ্দেশে গ্রিকদের বার্ষিক বসন্তকালীন উৎসবের নিবেদন ছিল মা দিবসের উদ্ভবের গোড়াপত্তনের ইতিকথা। গ্রিক উপকথার ক্রোনাসের স্ত্রী রিয়াকে (Rhea) সম্মান জানাতে গ্রিকরা এ উপলক্ষটিকে উদযাপন করত নানা আয়োজনে। এর আগ পর্যন্ত নারীর সম্মানে বা মায়ের সম্মানে এককভাবে এমন কোনো উৎসবের আয়োজন ছিল না। যে কোনো মায়ের জন্য এমন আয়োজন ছিল বিরল সম্মানের।
হিলারিয়া নামক এক বসন্ত উৎসব উদযাপন করত আদি রোমানরা। এ উৎসব নিবেদন করা হতো মাতৃদেবী সিবেলেকে। খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ বছর আগে এ উৎসব আরম্ভ হয় বলে জানা যায়। এ উৎসব উদযাপন প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের খেলাধুলাসহ বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত থাকত। কালক্রমে এ উৎসব আয়োজনে নানা ধরনের উচ্ছৃঙ্খল কার্যকলাপের সম্পৃক্তি ঘটলে জনমনে অসন্তোষ দেখা দেয়। ফলে সিবেলেকের অনুসারীরা রোম থেকে বিতাড়িত হয়।
আদি খ্রিস্টানরা তাদের লেন্ট (Lent) উৎসব (যিশুর উপবাস স্মরণে বিশেষ উপবাসব্রত) এর চতুর্থ রোববার মাতা মেরির সম্মানে এক ধরনের মা দিবস উদযাপন করত।
পরে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেনে প্রথম নিজের মাকে ঘিরে মা দিবস পালনের প্রথা শুরু হলেও আন্তর্জাতিকভাবে পালন শুরু উত্তর আমেরিকা থেকে।আনা জার্ভিস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোর ও ওহাইওর মাঝামাঝি ওয়েবস্টার জংশন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তার মা অ্যান মেরি রিভস জার্ভিস সারাজীবন ব্যয় করেন অনাথ-আতুরের সেবায়। মেরি ১৯০৫ সালে মারা যান। লোকচক্ষুর অগোচরে কাজ করা মেরিকে সম্মান দিতে চাইলেন মেয়ে আনা জার্ভিস। অ্যান মেরি রিভস জার্ভিসের মতো দেশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সব মাকে স্বীকৃতি দিতে আনা জার্ভিস প্রচার শুরু করেন। সাত বছরের চেষ্টায় মা দিবস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়। সেই থেকে আন্তর্জাতিকভাবে পালত হচ্ছে মা দিবস।উলে­খ্য, মে দ্বিতীয় রোববার আন্তর্জাতিকভাবে মা দিবস পালন করা হলেও নরওয়েতে ফেব্র“য়ারি মাসে দ্বিতীয় রোববারকে মা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
কেন ভিন্ন ভিন্ন তারিখে পালিত হয় মা দিবস?
শুরুটা হয়েছিল মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে কেন্দ্র করে। তবে এই বছর যুক্তরাজ্য দিনটি উদযাপন করবে ১১ই মার্চ। অন্যদিকে বেশ কিছু দেশে সেটা পালিত হবে ১৩ই মে। প্রতিটি দেশই চায় মা দিবস পালন করতে, মায়েদের প্রতি সম্মান জানাতে। তবে এই ক্ষেত্রে তাদের সম্মান জানানোর দিনটিতে থাকে ভিন্নতা। কেন? অন্য দেশের যদি মা দিবস মে মাসের রবিবারে পালিত হয়, তাহলে যুক্তরাজ্যে কেন সেটা মার্চ মাসে? প্রশ্নটি কেবল আপনার নয়। আরো অনেকের মাথাতেই এসেছে এই জিজ্ঞাসা। কারণটা খুব স্বাভাবিক এবং সহজ।

যুক্তরাজ্যের মা দিবসের আসল নাম ‘মাদারিং সানডে’। আর এই ব্যাপারটির সাথে মা দিবসের কিংবা আমাদের মায়েদের কোনো সংযোগ নেই। ভাবছেন, তাহলে মা দিবস কেন পালিত হয় সেখানে এই দিনে? কারণ আর কিছু না, পৃথিবীর আর অন্যের দেশের সাথে নিজেদেরকে মানিয়ে নেওয়া। আপনিই ভাবুন, আপনার পাশের দেশ যখন মা দিবস পালন করছে তখন আপনিই বা সেই স্রোতে গা ভাসাবেন না কেন? মাদারিং সানডে ব্যাপারটি এসেছে ১৬ শতক থেকে। সেই সময় ‘মাদার’ চার্চে যাওয়ার একটি ব্যাপার ছিল খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে। আর এই দিন পড়তো লেন্টে। লেন্টের চতুর্থ রবিবার পালিত হত দিনটি। লেন্ট অর্থ ইস্টারের সেই সময় যখন মানুষ তাদের কোনো না কোনো খারাপ অভ্যাস ছেড়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করে। এছাড়া কোনো খাবার বা পানীয়ে সমস্যা থাকলে সেটাও ছেড়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করে। মাদারিং ডে-তে সবাই তার নিজের পরিবার পরিজনের সাথে সময় কাটানো এবং আচার অনুষ্ঠান পালন করবে এমনটাই নিয়ম ছিল প্রাচীনকালে। সেই নিয়ম এখনো মানা হয়। বাড়ির কর্মচারীদের ছুটি দেওয়া হয় এই দিনে নিজের পরিবারের সাথে মিলিত হয়ে প্রার্থনা এবং সমস্ত আচার অনুষ্ঠান পালন করার জন্য। তবে খুব দ্রুত এই মাদারিং সানডেকে আরেকটু পাল্টে নিয়ে মায়েদের শুভেচ্ছা জানানো এবং উপহার দেওয়ার মাধ্যমে মা দিবসও পালন করে ফেলে এখন যুক্তরাজ্য একই দিনে। মা কতটা কাজ করছে, সেটির প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই দিনটি এখন পালিত হয় যুক্তরাজ্যেও। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দেখাদেখি বাকি দেশগুলো মে মাসেই পালন করে মা দিবস।
এদিক দিয়ে নরওয়ে অবশ্য একটু আলাদা। মার্চ কিংবা মে মাস নয়, সরাসরি ফেব্রুয়ারি মাসেই পালন করে ফেলে দেশটি মা দিবস। এই দিবস পালনের প্রক্রিয়া অবশ্য অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে নরওয়েতে। তাই দিনের হিসেবে একটু ভিন্নতা থাকলেও সেটা নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার নেই। শুধু তা-ই নয়, নরওয়েতে মা দিবস একেকটি বছর একেক দিনে পালিত হয়। যদিও মাস বদল হয় না। মাস থেকে যায় নির্দিষ্ট স্থানেই। মা দিবসের ক্ষেত্রে ভারত, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ আর অনেক দেশ আমেরিকাকে অনুসরণ করে। কিন্তু নরওয়ে আর যুক্তরাজ্যের মতো এই দিবস পালনে ভিন্নতা আছে মেক্সিকোর ক্ষেত্রেও। মেক্সিকোকে মে মাসের ১০ তারিখে পালিত হয় মা দিসব। ফলে একটু পাল্টে যায় পুরো ব্যাপারটি। যেমন, ২০১৮ সালে আমেরিকায় যখন মা দিবস পালিত হবে দ্বিতীয় রবিবার, তখন মেক্সিকোতে সেটা পালিত হবে কিছুদিন আগেই। দিন নয়, বরং তারিখ দেখে দেশটি মা দিবস পালন করে। কেন? কারণ জানতে হলে যেতে হবে ১৯২০ সালের দিকে।

সেসময় হুট করে সবার নজরে পড়ে যে, নারীরা মাতৃত্বকে নয়, বরং অন্যদিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। মাতৃত্ব যে অসম্ভব সম্মানজনক ব্যাপার, তা নারীদের বোঝাতেই শুরু হয় মেক্সিকোর মা দিবস। তবে কেবল এই দুটো একটি দেশ নয়। এছাড়াও ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি দেশে মা দিবস পালিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের চাইতে ভিন্ন দিনে। এখন প্রশ্ন হল, দিন কি আসলেই এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ? একদম নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল, মাকে আমরা কতটা ভালোবাসি সেটা। তাই কোনো নির্দিষ্ট দিন নয়, বরং মাকে ভালোবাসুন আর ভালোবাসার কথা জানান বছরের প্রতিটি দিন।

বাণিজ্যিক দিক
আন্তর্জাতিক করপোরেট জগৎ মা দিবসের উৎসবকে কেন্দ্র করে আর্থিক বিনিয়োগে উৎসাহী হয়ে ব্যবসায়-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ছে। ব্যবসা- বাণিজ্যে গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করছে। প্রচার প্রসার বাড়াচ্ছে, ফলে মা দিবস এখন আর শুধু সামাজিক উৎসব নয়, এটি একটি বৃহৎ আর্থসামাজিক বাণিজ্যিক উপলক্ষও হয়ে দাঁড়িয়েছে। নানা ধরনের পুষ্পস্তবক, কার্ড, গিফ্্ট বক্স, অলঙ্কার, সুগন্ধীসামগ্রী মায়ের উদ্দেশে নিবেদিত বাণী, বিশেষ ধরনের খাবার, পার্টি, গান, চিত্রাঙ্কন, ফটোফ্রেম, ডায়েরি, ভ্যানিটি ব্যাগ, চকোলেট, কেক, সাজসজ্জার সামগ্রী, সুসজ্জিত মোমবাতি, মগ, পোশাক, ওয়ালমেট, বিছানার চাদর, টেবিল ক্লথ, পোস্টার, ছড়া, কবিতা, গল্প, নাটক, গান, শোভাযাত্রা- কী নেই এ দিবসকেন্দ্রিক বাণিজ্যে? টাকার অঙ্কে হিসাব একেবারে উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার তো বটেই। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও জন্মদাত্রী মায়ের প্রতি আত্মার অনুভূতিকে ছাপিয়ে এ দিবস আজ আনুষ্ঠানিকতা ও আর দশটি সামাজিক ও লৌকিকতার উপলক্ষে পরিণত হতে চলেছে বলে অভিযোগ উঠছে।
তবু আমরা প্রতীক্ষায় আছি, তরুণ সমাজের বাণিজ্যপ্রীতি ও সমাজের আর্থসামাজিক অবস্থান আমাদের মায়েদের অবস্থাসূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে পরিবারের কেন্দ্রবিন্দুতে। পরিবর্তনের এমনতর ধারা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থাসূচকেও। যেসব সূচক দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক দিকনির্দেশ করে। সুতরাং মা দিবসকে ঘিরে অনুষ্ঠিত প্রতিটি পদক্ষেপই হোক অর্থবহ এবং আনন্দময়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

etiler escort taksim escort beşiktaş escort escort beylikdüzü