বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগকে হতে হবে সৎ ও নিষ্ঠাবান

পি.আর. প্ল্যাসিড: বাংলাদেশে পুলিশ প্রশাসন নিয়ে ভাল মন্দ নানা জনের নানা অভিমত রয়েছে। এসব অভিমতের পিছনে কারো কারো যে নিজস্ব অভিজ্ঞতা নেই তা বলা যাবে না। দেশে এখন অনেক ভাল কাজই পুলিশ বিভাগের সদস্যরা করছে। যে সকল কাজ আগে কখনো পুলিশ সদস্যদের তেমন করতে দেখা যায়নি। যুগের সাথে সরকার পরিবর্তন এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তার রদবদল হচ্ছে বলেই পুলিশে আগের চেয়ে শিক্ষিত সৎ ও সাহসীরা যোগদান করছে। আর ভাল কাজ যা কিছুই করা হচ্ছে সেগুলো তারাই করে সমাজে পুলিশের নষ্ট হওয়া ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। নতুরাই বেশী ভাল কাজ করে দেখাচ্ছে দেশবাসীদের।

দীর্ঘদিন কতিপয় পুলিশ সদস্যর বিভিন্ন অসামাজিক কাজ করার কারণে দেশের মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল এই বিভাগের উপর থেকে। যে কারণে এই ভাল কাজের কথা মানুষ যত না বলছে তারচেয়ে বেশী বলছে এখনও এই মহৎ কাজের দ্বায়ীত্বে নিয়োজিত অল্প সংখ্যক সদস্য যে অসামাজিক এবং অকল্যাণকর কাজ করে যাচ্ছে সেসব কাজের কথা।

এনিয়ে কথা বললে কারো কারো অভিমত, ” ভাল মন্দ নিয়েই মানুষ। গুটি কতক পুলিশ সদস্যের কুকর্মের জন্য পুরো পুলিশ প্রশাসনকে দোষ দেয়া যায় না”।

এ কথাও সত্যি যে পুলিশের সব সদস্য খারাপ হলে দেশে শুধুই খারাপ লোকদের জয় জয়কার হত। কথা হচ্ছে, অল্প সংখ্যক পুলিশ সদস্য যেই অপর্কম গুলো করছে সে গুলো এতটাই খারাপ যে তাদের মুষ্ঠিমেয় কয়েক জনের কারণে গোটা প্রশাসনকেই মানুষ খারাপ বলে। এরই মধ্যে প্রমানিত সত্য যে পুলিশ দেশে চাইলে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। সে ভালো কি খারাপ, দুটোই।

সুযোগ পেলে আমি পুলিশ কর্মকর্তাদের যাদের সান্নিধ্যে পাই তাদের সাথে দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলি। তারা কিন্তু কেউই আমার এমন কথায় একমত হন না। তাদের কথা, মানুষকে সচেতন করতে হবে। সচেতন না করা হলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না দেশে। কথাটির আংশিক মেনে নিলাম। তবে বাস্তবতা মনে হয় ভিন্ন।

আমি জাপান প্রবাসী হলেও বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াই। দেশে অনেক ছেলেমেয়ের সাথেই তাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন নিয়ে কথা বলি। জানতে চাই বড় হয়ে তারা কি হতে চায়? এই প্রশ্নের খুব সহজ সরল উত্তর আসে, তারা বড় হয়ে পুলিশ অফিসার হতে চায়। ওদের এমন ইচ্ছের পিছনে প্রথম ও প্রধান যে কারণটি ওরা বলে তা হচ্ছে পুলিশ হলে সততার সাথে মানুষের সেবা করা যায়। পুলিশ কোন অন্যায় করে না অন্যায় প্রশ্রয়ও দেয় না বরং অন্যায়কারীদের শাস্তির ব্যবস্থা করে।

পুলিশ বিভাগের উপর কোমল মতি এই ছেলে মেয়েদের বিশ্বাস ও আস্তা দেখে মন ভরে যায়। কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্কদের কাছে পুলিশ প্রসঙ্গে এমন প্রশ্ন করলে শোনা যায় ভিন্ন উত্তর। এই দেশটিতে নাকী সাংবাদিক পুলিশ আর আইনজীবী সবচেয়ে বেশী খারাপ। তাদের কারণেই দেশটা আমাদের উচ্ছন্নে যাচ্ছে। এর পিছনে যুক্তি প্রমাণ দিয়েই তারা কথা বলে।

আজকাল দেশের বিভিন্ন পত্রিকার অনলাইন ভার্সনের দিকে চোখ রাখলে প্রায় প্রতিদিন কোন না কোন খবর দেখা যায় যা পুলিশ দ্বারা সংগঠিত। তার কিছু ভাল এবং প্রশংসনীয় তবে বেশীর ভাগ খারাপ ঘটনার সংবাদই চোখে পড়ে। যার পরিমান দিনদিন নজরে আসছে বেশী। এসব পুলিশ প্রশাসন কেন রোধ করতে পারছে না, তা আমার বোধগম্য নয়। দেশে সম্প্রতি ধর্ষনের ঘটনা বাড়ছে। সাভাবিকভাবেই ধর্ষিতা থানায় গিয়ে বিচার পাবার আশায় থানার সরণাপন্য হয়। সেখানে কখনও কখনও বিচার চেয়ে উল্টো ধর্ষিত হবার সংবাদ প্রায় পড়ি। বিনা দোষে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যেতে হয় অনেককে, পকেটে মাদক দ্রব্য ভরে দিয়ে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয় সাধারণ নির্দোষদের। কত রকম ঘটনা যে আছে, লিখলে লেখা বড়ই হবে শুধু।

সম্প্রতি ফেনী জেলার সোনাগাজীতে যে ঘটনা দেশবাসীর নজর কেড়েছে সেটাকে পুলিশ প্রশাসন অস্বীকার করবে কিভাবে? নুসরাম মরে গিয়ে প্রমাণ করেছে সে যে কত সাহসী। তার এই অকাল ও করুণ মৃত্যুর পিছনে সেখানকার পুলিশ প্রশাসনে জড়িত থাকার বিষয়টি খুবই দুঃখ জনক। এমন অনেক ঘটনাই আছে আমরা জানি না। আমি একবার এক পুলিশ অফিসারকে বলেছিলাম, সরকার যদি পুলিশের উপর সব ঠান্ডা করার দ্বায়ীত্ব দিয়ে দেন আমার মনে হয় অল্প সময়ের মধ্যে দেশের পুরো চেহারা পাল্টে দিতে পারবে। অফিসারটি আমার কথায় হঠাৎই রেগে গিয়ে বললেন আমার ভুল ধারণা। হতে পারে সেটি আমার ভুল ধারণা তবে আমি আমার বিশ্বাস থেকে কথাটি বলেছি। এমন বিশ্বাস জন্মালো পুলিশেরই কিছু কর্মকান্ড থেকে।

এমন কিছু কাজের অপারেশন করায় তারা সার্থক হয়েছে যে, সেখানে তাদের শুধুই সদিচ্ছা, সততা এবং ঐকান্তিকতা ছিল। তাই যদি হয় তাহলে অন্য সকল কাজে কেন ব্যর্থ? দেশে সাগর-রুনি, তনু, মিতু সহ আলোড়ণ সৃষ্টিকারী আরো বেশ কিছু খুনের ঘটনা আছে যার রহস্য এখনো আমাদের কাছে ধোয়াশা। দেশের প্রধানমন্ত্রী বললেই যে তারা সততার সাথে কাজ করবে আর না বললে করবে না এমন যদি হয় তাহলে সরকার একসময় হুমকীর মুখে পরবেই। দেশবাসীকেও থাকতে হবে নীরাপত্তা হীনতায়।

সোসাল মিডিয়ার কল্যাণে ব্যারিস্টার সুমনের কিছু বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়েছে। তিনি একটি কথা স্পষ্ট বলেছেন, থানায় ওসির রুমে যদি কোন মেয়ের জন্য নীরাপদ না হয় তাহলে বাংলাদেশের আর কোথাও মেয়েদের জন্য নিরাপদ হবে না। আরেকটি বিষয় পুরো পুলিশ বিভাগকে উদেশ্য করে বলা হয়েছে, মানুষ বিপদে যাদের কাছে আশ্রয় ও নিরাপত্তা চেয়ে মাথা রাখবে তারাই যদি উল্টো ঘটনা ঘটায় তাহলে সাধারণ মানুষদের পুলিশের প্রতি আর আস্থা ও বিশ্বাস রাখবে না।

যতটুকু জানি বর্তমান সরকার এই পুলিশ বিভাগের সকল সদস্যদের বেতন সহ অন্যান্য সকল সুযোগ সুবিধা আগের চেয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে। বেতন আর সুযোগ সুবিধা বাড়ালেই যে পুলিশের চরিত্র বদলাবে এমন কিন্তু নয়। সর্বপ্রথম চাই মানসিকতার পরিবর্তন। তা না হলে যেই লাউ সেই কদুই থেকে যাবে। এখানে আমার প্রশ্ন, যে অফিসার গুলোকে র‌্যাব, পিবিআই বা অন্য কোন বিভাকে দিলে যতটা সততার সাথে কাজ করে দক্ষতার প্রমাণ দেন তারা পুলিশে থেকে সেই কাজটি করতে কেন অপারগ হন?

মাণনীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়টিকে আরো বেশী দ্বায়ীত্ববান ও সৎ মানুষদের দিয়ে পরিচালনা করার ব্যবস্থা করতে হবে না হলে নুসরাতের এই পৃথিবী থেকে অল্প বয়সে বিচার না পেয়ে চলে যাওয়ার মত আরো অনেক ঘটনা ঘটবে যা আপনার নজরে নাও আসতে পারে। আপনি কত নুসরাতের বিচার করতে আদেশ নির্দেশ আর তদারক করবেন? আপনার তো অনেক কাজ, অনেক ব্যস্ততা। আপনার বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে এবং দেশ ও জনসাধারণের নিরাপত্তা ও মঙ্গল কামণা করবে তাদের দিয়ে পুলিশ বিভাগ চালানোর ব্যবস্তা করুন। দেখবেন এতে আপনার অনেক কাজ করতে সুবিধা হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে দেশের মানুষের সেবা করে জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারছেন।

আপনার শাসনামলেই সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে অপরাধকারী কোন পুলিশের দোষ প্রমাণীত হলে তাকে বরখাস্ত বা বদলীই নয় শুধু দ্রæত বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে তবেই এই বিভাগের সদস্যরা আপাদমস্তক বদলাতে পারবে।

——————
লেখাক : জাপান প্রবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *