মতামত-বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ-আন্তর্জাতিক অঙ্গণে লালন গীতি-(৪)

আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ্ : আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ্: লালন গীতি জনপ্রিয় করতে যারা অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেনঃ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন মরমী কবি ছিলেন। লালনের মরমী সংগীত এবং দর্শন রবীন্দ্রনাথকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল তা তিনি বার বার বিভিন্ন বক্তব্য, লেখায় স্বীকার করেছেন এবং তা রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন কবিতা, গান, লালনের গানের ইংরেজি অনুবাদ ও প্রচার থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। তবে পারিবারিক জাত-কূল, আর্থ-সামাজিক অবস্থান, শ্রেণি, শিক্ষা, ধর্মবিশ্বাস, অভিরুচির কারণে রবীন্দ্রনাথের মরমীবাদ লালনের মরমীবাদ থেকে অনেক স্বতন্ত্র এবং আধুনিক নাগরিক সমাজ উপযোগী। কবিগুরু কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির প্রতাপশালী অভিজাত ঢনাঢ্য জমিদার ঘরানার শহুরে শিক্ষিত ভদ্রলোক, ব্রাহ্ম ধর্মে আস্থাশীল, ভীষন বিলাসী, প্রকৃতি প্রেমি এবং ভ্রমন পিপাসু ছিলেন। ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসন, সমাজের অভিজাত শ্রেণির জমিদার, শিক্ষিত পেশাজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবার এবং মানুষদের সাথে তার বসবাস ও উঠাবসা ছিল। এজন্য তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সরকার, যুক্তবাংলার জমিদার শ্রেণি এবং কলকাতার বাবু সমাজের বিশেষ আস্থাভাজন ব্যক্তি। তাই তাকে কখনো কোনপ্রকার শ্রেণি সংগ্রাম করতে হয়নি এবং সমাজপতিদের বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ম্যাটিকুলেটর পাস/ক্লাস টেন পাস হলেও দেশবিদেশের প্রচুর সংবাদপত্র ও গ্রন্থ এনে নিয়মিত পাঠ করার, জ্ঞান আহরণ, ইংরেজি ভাষা চর্চা করার, দেশবিদেশের বিভিন্ন স্থান ভ্রমনের মাধ্যমে দেশবিদেশের সমসাময়িক অবস্থা, সভ্যতা, সংস্কৃতি, প্রকৃতি দেখার এবং সেখানকার মানুষদের সাথে মেলামেশা করার, ভাব-জ্ঞান আদান- প্রদানের, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, ঐতিহ্য, সাহিত্য জানার সুযোগ লাভ করেছেন। তাই তিনি তার উপলব্দ মরমী দর্শন(অর্থাৎ বরীন্দ্র দর্শন)-কে শহরের শিক্ষিত ভদ্রলোকের এবং বিশ্বের নাগরিক সমাজের উপযোগী করে লিখেছেন। একজন প্রকৃতি প্রেমী এবং ধার্মিক কবি হিসাবে রবীন্দ্রনাথ তার নিজস্ব উপলব্দ মরমী দর্শনের সাথে প্রকৃতিবাদ ও আধ্যাত্ন চিন্তাকে গভীরভাবে যুক্ত করেছিলেন। ফলে রবীন্দ্রনাথের মরমীবাদ হয়েছে প্রকৃতি বন্দনা এবং আধ্যাত্ন নির্ভর।

লালন জীবনে মনিরুদ্দিন শাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। লালন যখনই কোনো গান বাঁধতেন, মনিরুদ্দিন শাহকে ডাকতেন এবং গেয়ে শোনাতেন। মনিরুদ্দিন শাহ সেই গান শুনে লিখে রাখতেন। এখন পর্যন্ত লালনের যে সমস্ত গান পাওয়া গেছে তার বেশীর ভাগ কৃতিত্ব মনিরুদ্দিন শাহের। এছাড়া কাঙ্গাল হরিনাথ এবং মীর মোশারফ হোসেন শিক্ষিত নাগরিক সমাজের মাঝে লালনের পরিচিতি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তবে বিশেষত লালনের ব্যক্তিত্ব ও তার সংগীতের প্রতি কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের সদস্যদের ব্যাপক আগ্রহ, আন্তরিকতা, শ্রদ্ধা, সহানুভূতিশীলতা ছিল শহরের নাগরিক সমাজের মানুষের কাছে লালন ও তার সংগীতের পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠার অন্যতম কারণ। ফলে কিছুটা দেরিতে হলেও লালন সংগীতের ভাব রস এবং দর্শন গ্রামীণ লোক সমাজকে ছাড়িয়ে শহুরে নাগরিক সমাজকেও ব্যাপকভাবে ভাবিত ও আলোড়িত করেছে। এখন উপমহাদেশে বাউল এবং লালনের গান বেশ জনপ্রিয়। বাউল গানকে সর্বোচ্চ অবস্থানে নিয়ে যেতে লালন সাঁই’র ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। লালনের গানের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরবর্তীকালে উপমহাদেশে অসংখ্য বাউল সংগীত শিল্পীর আবির্ভাব ঘটে। লালন গীতিকে কেন্দ্র করে অসংখ্য প্রতিভাবান বাউল ও আধুনিক ক্লাসিক ও ব্যান্ড শিল্পী জীবনে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। লালনের মৃত্যুর প্রায় দেড় শত বছর পরও বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি লালন সাঁই’র গানে। এখনও তরুণ প্রজন্ম ভাবিত ও উদ্বুদ্ধ হয় কিংবদন্তি লালনের বাউল গানে। যে আকর্ষন ও মায়ার টানে লালনের গান আজ পর্যন্ত তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠে লালিত হয়ে আসছে দারুণভাবে। এমনই অমূল্য গানের ভাণ্ডার বাউল গানের সম্রাট লালন সাঁইজী রেখে গেছেন, যার মাধ্যমে প্রায় দেড়শত বছর ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের হৃদয় আলোকিত হয়ে চলেছে। বিশেষত বাংলাদেশ/বাঙালী মুসলমান শিল্পীদের কাছে লালনের আধ্যাত্নিক, গুরুতত্ত্ব, মারফতি, আল্লাহ-নবী তত্ত্ব, মুর্শিদী, দেহতত্ত্ব, আত্নতত্ত্ব, পরতত্ত্ব, প্রেম, মানব বন্দনামূলক গানগুলো এবং পশ্চিমবঙ্গ/বাঙালী হিন্দুদের কাছে লালনের কৃষ্ণ-গৌড় তত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, আত্নতত্ত্ব ও পরতত্ত্ব, প্রেম, জাতিবাদ বিরোধী, মানব বন্দনামূলক গানগুলো অধিক জনপ্রিয়।
লালন গীতিকে জনসাধারণের মাঝে জনপ্রিয় করে তুলতে পুঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহ, শাহ আবদুল করিম, ফরিদা পারভীন অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। আমাদের দেশের এবং উপমহাদেশের প্রখ্যাত লালন সংগীত শিল্পী ফরিদা পারভীন সর্বপ্রথম লালন সংগীতকে বাংলাদেশে শহুরে শিক্ষিত ও সংগীত রসিক নাগরিক সমাজের উপযোগী করে লোকজ লালন গীতিকে আধুনিকভাবে গেয়েছেন। তিনি তার দীর্ঘ সংগীত জীবনে লালনের প্রায় সব জনপ্রিয় গানই গেয়েছেন। ফরিদা পারভীনকে লালনের ‘মানস কণ্যা’ বলে অভিহিত করা হয়। লালন গীতির জন্য তিনি বিভিন্ন ধরনের জাতীয় সম্মাননা অর্জন করেছেন। তার পূর্বে লালন গীতি কেবল পুরুষ বাউল শিল্পীরাই গাইত। ফরিদা পারভীন শত বছরের অধিক প্রাচীন প্রথা ভেঙ্গে প্রথম নারী সংগীত শিল্পী হিসাবে লালন গীতি গাইতে শুরু করেন। ফরিদা পারভীনের গুরু ছিলেন খোদা বক্স। বাউল শিল্পীদের মধ্যে শাহ আবদুল করিম সর্বপ্রথম বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদক লাভ করেছেন। এক সময় ফরিদা পারভীন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, নাগরিক সমাজে সাঁইজীর গান আজো গ্রহনযোগ্যতা পাচ্ছে না। তবে এই ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারনা ও অভিমত, নব্বই দশকের সময় থেকে ক্লোজাপ সংগীত প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠানের শিল্পী বিউটির হাত ধরে নাগরিক সমাজের মাঝে লালন সংগীতের নব জাগড়ণ শুরু হয়, নবজোয়ার আসে। ক্লোজাপ শিল্পী বিউটি লালন গীতির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সংগীতপ্রেমী, শিল্পী এবং দেশবাসীর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষন করে ‘লালন কন্যা’ হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। শফি মন্ডল তার গুরু। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে বাংলা ও বাহকের ভোকাল আনুশেহ আনাদিল, লালন ব্যান্ডের ভোকাল সুমি, তাপশের উইন্ড অব চেইঞ্জ সংগীতানুষ্ঠান, ভারতীয় বাঙালী ক্লাসিক ও ব্যান্ড শিল্পীদের মাধ্যমে দেশবিদেশে শহুরে নতুন প্রজন্ম, নাগরিক সমাজের মাঝে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লালন সংগীতের জনপ্রিয়তার উল্লেখ্যযোগ্য প্রসার ঘটেছে।

শাস্ত্রীয় সংগীতে অভিজ্ঞ বাংলা ব্যান্ড, বাহকের ভোকাল আনুশেহ আনাদিলই সর্বপ্রথম বাংলা ব্যান্ড সংগীত জগতে এবং ধারায় লালন সংগীতের অভিষেক ঘটান। আনুশেহের পথ ধরে ব্যান্ড লালনের অনন্য প্রতিভাময়ী ভোকাল, ফোক সিঙ্গার সুমি নাগরিক সমাজের উপযোগী করে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে রক স্টাইলে লালন গান গেয়ে লালন সংগীতকে নতুন ভাব, সুরের রসনা, শৈল্পিক ছন্দ, অনন্য উপস্থাপনায় এক অনবদ্য মাত্রা দিয়েছেন। এগিয়ে এসেছেন ওয়ারফেজ, শূণ্য, অর্থহীন, চাতকের মত জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোর ভোকালরা। অপরদিকে ফরিদা পারভীন, শাহ আবদুল করিম, টুনটুন বাউল, বাউল শফি মন্ডল, অরূপ রাহী লালন গীতিকে যথাসম্ভব বিশুদ্ধরূপে তুলে ধরার এবং ধরে রাখার প্রচেষ্টা করছেন। ফরিদা পারভীন লালনের মানস কণ্যা, বিউটি লালন কণ্যা হলে আনুশেহ লালন সংগীতের চাতক পাখি এবং লালন ব্যান্ডের সুমিকে লালন রক স্টার বলা অধিক যুক্তিযুক্ত হবে। বাংলা ও বাহক ব্যান্ডের আনুশেহের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সুরের, লালন ব্যান্ডের সুমির চড়া রক সুরের, ওয়ারফেজের মেটাল রিদমের এবং অন্যান্য দেশি-ভারতীয় শিল্পী ও ব্যান্ডের পপ ও ক্লাসিক স্টাইলে লালন সংগীত পরিবেশনা সনাতন লালন সংগীতের গন্ডী ভেঙ্গে লালন সংগীতকে আধুনিক রুচি ও চেতনার ভিত্তিতে নাগরিক ও বৈশ্বিক রূপ দিয়েছে। দেশবিদেশের নতুন প্রজন্ম এবং নাগরিক সমাজের মাঝে লালন সংগীত ও লালনকে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তুলেছে। এখন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পীদের মাধ্যমে লালন সংগীত সারা ভারতের নাগরিক সমাজের মাঝেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশবিদেশের লালন ভক্ত ও অনুসারী কবি, লেখক, সংগীত শিল্পী, দার্শনিক, লেখক, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সমবেত প্রচেষ্টাতে রবীন্দ্র সংগীত এবং নজরুল সংগীতের মত লালনগীতিও তার স্বতন্ত্র সংগীত বৈচিত্র‍্য নিয়ে উপমহাদেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ব্যাপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন। সর্বশেষ পর্ব তথা ৪র্থ পর্বে সমাপ্ত। asifultasin18@gmail.com

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

mersin escort mut escort mersin escort canlı tv izle konya escort
sakarya escort sakarya escort sakarya escort sakarya escort sakarya escort
sakarya escort sakarya escort ümraniye escort serdivan escort
ankara escort ankara escort bayan escort ankara
Balıkesir escort Manisa escort Aydın escort Muğla escort Maraş escort Yozgat escort Tekirdağ escort Isparta escort Afyon escort Giresun escort Çanakkale escort Trabzon escort Çorum escort Erzurum escort Zonguldak escort Sivas escort Düzce escort Tokat escort Osmaniye escort Didim escort Kütahya escort Mardin escort Van escort Yalova escort Şanlıurfa escort Ordu escort Alanya escort Fethiye escort Sakarya escort Konya escort Elazığ escort Kayseri escort Hatay escort Diyarbakır escort Kocaeli escort Gaziantep escort Adana escort Van mutlu son Maraş mutlu son Şanlıurfa mutlu son Isparta mutlu son Amasya mutlu son Afyon mutlu son Denizli mutlu son Kayseri mutlu son Eskişehir mutlu son Tekirdağ mutlu son Adana mutlu son Çanakkale mutlu son Kayseri mutlu son Denizli mutlu son Tokat mutlu son Yalova mutlu son Sivas mutlu son Kırklareli mutlu son Osmaniye mutlu son Mardin mutlu son Zonguldak mutlu son