প্রবাসী কবি মোহিত চৌধুরীর ৫টি কবিতা

প্রদীপের প্রাণ
তোমাকে জ্বালাতে কত প্রদীপ শিখার প্রাণ গিয়েছে?
ঝড়-ঝঞ্জা প্লাবন মরুবক্ষে জে¦লেছো নিজে ক্ষয়ে।
অন্ধকারের তৃষিত ভূমে জে¦লেছো সভ্যতার আলো।
দানিয়াছো তুমি কত শত জ্ঞানী মহাবিজ্ঞানী।
তোমারই আলোক প্রাণ যৌবনে,
অন্ধকার ভেদিয়া জে¦লেছো তুমি।
নিরন্নের জীর্ণ-শীর্ণ কূটিরে।
পুরোহিতের নাট মন্দিরে।
চন্ডাল মূচির জুতো সেলাইয়ের সূঁচে!
গর্ভবতী নারীর প্রসব বেদনার ছন্দে।
সদ্য প্রসূত নবজাতকের উদ্দাম হাসির উল্লাসে।
অক্ষয় অবিনাশী মাতৃ বিশ্বাসে,
ওই শিশুটির ললাটে এঁকে দেয়া কালো রাজতিলকে।
মোর প্রিয়ার আঁখিপাতে।
শোষিতের অন্ধকার কূটিরে।
তোমারই প্রাণ বিসর্জনে আমরা পেয়েছি আলো।
সান্ধ্যরাগে মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে মোর কুটিরে,
অশুভ অন্ধকার তাড়িয়েছি তোমারই প্রদীপ্ত প্রাণে।
মাতৃক্রোড়ে শিশুতোষ পড়েছি তোমারই দেবালয়ে।
প্রদীপ ওগো প্রদীপ তুমি যে আলোয় ভরা।
তোমার কাজ ছিল শূধুই আলোক দেয়া।
কে তোমায় রেখেছে মনে?
অন্ধকার ফুরালে?

ফ্লোরেন্স, ইটালী
সোমবার প্রথম প্রহর, ২০ মে ২০১৯ইং।
—- — — — — — — —

অদ্ভুত মানুষ

কোন পক্ষপাত নেই
কোন প্রতিহিংসা নেই
কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই
কারো প্রতি ক্ষোভ-বিক্ষোভ নেই।
নেই কোন ঘুনা,
প্রতিহিংসার যোগ্য কোন প্রাণ নেই
প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোন প্রতিদ্বন্দ্বক নেই।
ঘৃনাবানের জলোচ্ছ্বাসে
সাঁতার কেটেছি আমি
কখনোতো হইনি ক্লান্ত।
উত্তাল ঘৃনাসমুদ্রের রুদ্রনীলে,
রুখবে আমায় কে?
যশ্ চাইনা সম্মান চাইনা খ্যাতি চাইনা,
নেতৃত্ব চাইনা প্রতিষ্ঠাও চাইনা।
জীবন আমার যতই বিবিধ ঐন্দ্রজালিক,
যন্ত্রনাময় হোকনা কেন
নিভৃতচারী এক চেতনাস্নাত প্রাণ।
শোষিত হৃদয়ের দাবানল শিল্পের,
শিল্পময় মাঠে নিরন্তর ছুটে চলা
জীবন আমার প্রবল পদ্ম রাগে,
কেবল ছুটে চলে সসীম পানে।

দিকে দিকে আজ হিংসা বিদ্বেষ!
অবিশ্বাস-অবিচার, ব্যভিচার
নপুংশুক নষ্ট সময়,
সম্পদের নেশায় বিকট হৃদপিন্ড!
শত্রুহাত ক্রমাগত উদ্যত ঐশীবাণীর বহ্নিশিখায়,
সত্যের অগ্নিবীণায়, জ্বালাবো চিতা মিথ্যার পরাকাষ্ঠে।

ফ্লোরেন্স, ইটালী
শুক্রবার, রাত্রি ১১:৩৩মি
১৪ জুন ২০১৯ইং
—————————-

মানুষ হলে

আমিতো মানুষ নই!
মানুষ হলে মানবতা থাকবে, সত্য ও সৌন্দর্য থাকবে,
শৃঙ্খলা থাকবে, নব প্রাণের বীর্যমন্ত্রে,
জাগরণের মমত্ববোধ থাকবে
ক্ষমা শিল্পের জয়োল্লাস থাকবে,
শ্রেণী সমতা থাকবে, মৌলিক জীবন শিল্পের সুসম বন্টন থাকবে,
পৃথিবী আমার জন্মান্তরের অধিকার সৃজনশীল চেতনার মূল্যবোধে,
নিপুণ জীবন শিল্পবোধ থাকবে।

আমিতো মানুষ নই!
বন মানুষ থেকে আধুনিক সভ্য মানুষে, শুধুই বিবর্তন
আকার আকৃতিতে পরিবর্তন, স্থুল সুক্ষ্ম জ্যোতির অবয়বে,
মানব জ্ঞান চেতনার স্বর্গালোকে শুধুই প্রহেলিকার পরিভ্রমণ!

আমার রয়েছে ইন্দ্রিয় সুখানুভুতি
বিপরীত লিঙ্গের প্রতি দুনীর্বার আকর্ষণ, ক্রোধের ভিসুভিয়াস,
সামন্ত ভূ-স্বামীদের মতো দোর্দন্ড প্রতাপ, পরধনলোভী মন।
ঈর্ষার অনলে জ্বলে, আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভা,
পুরবীর ললাটের রক্তমাখা লালটিপ,
অমাবস্যা পূর্ণীমার শুভংকরের ফাঁকি, মেঘে মেঘে বেলা!

আমিতো মানুষ নই!
মানুষ হলে আমাকে নিয়ন্ত্রণে কেন ঐশী যত বানী?
আঠারো হাজার প্রজাতিতে নেইকো কেন নিয়ন্ত্রিত বাণী?
তবে কি প্রজাতিতে আমিই অধম? রেস্তো সব উত্তম?
(রেস্তো কথাটি ইটালীয়ান শব্দ। বাংলা বাকি শব্দের সমার্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত)
ফ্লোরেন্স সিটি, ইটালী
রবিবার প্রথম প্রহর
১৬ জুন ২০১৯ইং
——————————
মানবতার সংকট

সংকট সংকট সংকট মহাসংকট!
পৃথিবীব্যাপী মানবতার সংকট
শোষকের রক্তাক্ত স্বার্থের আঘাতে,
শোষিত জর্জরিত বিভৎস
উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল প্রাণ স্বার্থের চাবুকের আঘাতে ছোটে,
স্বার্থপর স্বার্থের স্বার্থ অশ্ব।
ভাঙ্গে নগরী চূর্ণ করে স্বার্থের ইমারত
মনুষ্য সমাজ সভ্যতা সংস্কৃতি
যতসব ধর্মনীতি সমাজনীতি রাজনীতি,
পোড়ায় বিবেকের সৃজনশীল চেতনা।
রুখে দেয় আগামী পৃথিবীর দার্শনিক কবিতা সমগ্র প্রগতির উৎসব
সমতার এক পৃিথবী!
শ্রেণী ঘৃনা? শ্রেণীর ভেতরের শ্রেণী?
শ্রেণী সংগ্রাম? গণতন্ত্র?
স্বার্থের দাবানলে জ্বলছে।
সংখ্যাহীন বেকারের সুদীর্ঘ মিছিল
পুষ্টিহীনতার নগ্ননৃত্য উল্লাসে দুলছে,
পৃথিবীর অসংখ্য মানব শিশু
সদ্যবিবাহিত নবদম্পতির ফুলশোভিত ফুলশয্যার রাত,
দেশপ্রেমিকের প্রিয় মানচিত্র
বারুদের বাগিচায় গন্ধরাজের কি বিভৎস করুণ মৃত্যু।
অতঃপর মানবতাগুলো নির্বিকার নিস্তব্ধ নিস্ক্রিয়
আষাঢ়ী নব ঘন বর্ষায় বারিসিক্ত শ্রাবণ ভুমে
তবে কি পূর্ব পূরুষের পৌরুষে, চেতনার বীর্যমন্ত্রে,
জেগে ওঠার বজ্রমন্ত্রে পরাশোষকের মাথার উপরে।
মানবতার সংকট বজ্রনৃত্য করবে না?
তবে কি লেখক কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবির
রক্তস্নায়ুতে মানবতার সংকট?
শব্দের হাতুড়ী পেটাবে না? নয়তো ক্লীবের জলশায়,
নপুংসক কলম সমগ্র।
পূর্নিমার ভাগীরথিতে আরামে দোলুক
কে আছো জোয়ান? হও আগুয়ান
অমাবস্যার অগ্নিবাঁধে আমরাই মানবতার দ্বীপ জ্বেলে যাই।

ফ্লোরেন্স সিটি, ইটালী
শনিবার বিকেল ৪ঃ৩২মিঃ
২২ জুন ২০১৯ইং
———————

তোমার প্রিয় পাইপ

শুন্য গগনের দীপ্ত নক্ষত্রলয়ে,
উল্কার গতিপথে ঝলসে ওঠে
তোমার প্রিয় পাইপ
শুধুই কি পাইপ? বিষক্রিয়া? তামাক?
নাকি উল্কারাগে যুগে যুগে ভিসুভিয়াস!
জ্বেলেছ তোমার ব-দ্বীপ মানচিত্রের ঠোঁটে
অগ্নি কাষ্ঠ তামাক বারুদমাখা প্রলেপে।
দম নিতে তোমার প্রিয় পাইপে
অগ্নির মন্ত্র জ্বেলে কাষ্ঠের পেয়ালাতে,
ভূগোলের তামাক মেখে স্বদেশ ভূমের ভীম কারার ওই ভিত্তি মূলে।
বাতাসে বারুদের গন্ধ ওড়ে
তোমার চিন্তামগ্ন অভিজাত পাইপের ব্যক্তিত্বের পেয়ালাতে
কি বিপ্লবী স্পর্ধায় জ্বেলেছো তুমি।
সাম্প্রদায়িকতা, শ্রেণী ঘৃনা, শোষণ
দাসত্ববাদী চেতনা, নিয়ন্ত্রিত ভুগোল
হিংসা, বিদ্বেষ, বিগ্রহ জাতিতে জাতিতে সংঘর্ষ।
তোমার পাইপের নীলাদ্রি নীলাভ ধোঁয়ার গন্ধে
সাতকোটি কৃষ্ণচূড়া, সুদৃঢ় ঐক্যের বজ্রমন্ত্রে
পৃথিবী ভূগোল থেকে ছিনিয়ে আনলো স্বদেশ ভূমি।
অসাম্প্রদায়িক চেতনার বীর্যমন্ত্রে
শৃঙ্খল মুক্তির প্রলয় বিশান বাজে ওই নবপ্রাণ জয়োল্লাসে।

ফ্লোরেন্স সিটি, ইটালী
শনিবার দ্বী-প্রহর
৩ আগস্ট ২০১৯ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

etiler escort taksim escort beşiktaş escort escort beylikdüzü