প্রবাসী কবি মোহিত চৌধুরীর তিনটি কবিতা

শ্রমমজুর
শ্রমমজুর আমি জীবন শিল্পের শ্রমমজুর
জীবন দানে প্রাণ রয়েছে,
পেয়ালাতে জীবনের সূরারী
আমি পিপীলিকার থেকে প্রেরণা নিয়ে।
কাল বোশেখীর সন্ধ্যে কিংবা জৈষ্ঠ্যের চন্দ্রালোকে,
আষাঢ় তিথির অরুণালয়ের তরুণ বেদীতে
শ্রাবণ কাব্যের অমাবস্যা পূর্ণীমার সন্ধিক্ষণে
জীবন শিল্প রচি।
ভরা ভাদ্রে সুমিষ্ট ওই তালপাকার ঘ্রানে,
আমার সুদৃঢ় পেশীগুলো আশ্বিনের রূপালী চাঁদে দোল খায়
শরৎ শুভ্রাকাশে শরৎ চাঁদের দোল!
যুবাশশীর যুবশক্তি কার্তিকেরই শক্তিতে দৃশ্যমান আমার সুদৃঢ় পেশীগুলো।
অঘ্রাণের দিগন্ত বিস্তৃত সোনালী ফসলের,
শিল্পময় মাঠে সমগ্র দিনমান শ্রমমজুর
পৌষালী সন্ধ্যে কিংবা মাঘীহেম চন্দ্রালোকে,
ফাগুনের মৃদুল বাঁয়ে জীবনের জলসাঘরে।
শ্রমমুখর জীবন শিল্পের দোলযাত্রা বিদগ্ধ চৈত্রের উত্তপ্ত খরতাপে
নৃত্যরত রোদ্দুরে আমার গ্রন্থিল বাহু,
ঝলসানো জীবন শিল্পে অসাম্যের বিরুদ্ধে,
সাম্যবাদী বাহু বিদ্রোহে বিপ্লবে জেগে ওঠে।
পোড়ায় অসাম্যের সমাজ, ভাঙ্গে পরাশোষকের ঈমারত
বিন্দু, বিন্দু ঘর্মাক্ত বাহুর আঘাতে
চুর্ণ করি শোষকের ইস্পাত শৃঙ্গ,
বিনির্মাণ করি শোষিতের গৃহ।

ফ্লোরেন্স সিটি, ইটালী
বুধবার বিকেল ৫:১৮মিঃ
১৪ আগস্ট ২০১৯ইং

অশ্রুপাত নয় অশ্রুদ্রোহ

পিতৃ হত্যার প্রতিবাদে
অশ্রæপাত নয় অশ্রæদ্রোহ,
ওরা বুলেট ছুঁড়েছে
বাংলার মানচিত্রের বুকে।
গনতন্ত্রের বুকে, সমাজতন্ত্রের বুকে
ধর্মনিরপেক্ষতার বুকে,
বাঙালী জাতীয়তাবাদের বুকে,
ওরা বুলেট ছুঁড়েছে জাতীয় পতাকার বুকে, জাতীয় সঙ্গীতের বুকে।
স্বাধীনতার বুকে, সার্বভৌমত্বের বুকে
শাসনতন্ত্রের বুকে,
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুল্যবোধের বুকে,
ওরা বুলেট ছুঁড়েছে গীতাঞ্জলি অগ্নিবীণা রূপসী বাংলার বুকে।
ঈদ, দুর্গাপূজা, বৌদ্ধপূর্ণীমা, বড়দিন, পহেলা বৈশাখ,
জারী-সারী, ভাটিয়ালী,
হাসন রাজার বুকে,
পদ্মা মেঘনা যমুনা কংস গড়াই ব্র²পুত্রের বুকে।
ভাওয়ালগড় ময়নামতি বরেন্দ্র মহাস্থানগড়
সুন্দরবন অববাহিকায়,
অনার্যের অস্তিত্বের বেদীমূলে
ওরা বুলেট ছুঁড়েছে।
স্বদেশী আন্দোলন, নীল বিদ্রোহ
ফরায়েজ বিদ্রোহ, টংক বিদ্রোহ,
তে-ভাগার বিস্ফোরিত লাঙ্গলের ফলায়!
যুক্তফ্রন্টের বিজয়রাগে, বাষট্টির শিক্ষাকমিশনের ঝড়ে।
বাঙালীর মুক্তিমন্ত্রের ছ’দফার বজ্রনৃত্যে
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এগারো দফার বুকে,
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের জলোচ্ছ¡াসের বুকে
ওরা গুলি ছুঁড়েছে বাঙালির চেতনাতে।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূরমূর্চ্ছনা ও চরম পত্রের বুকে
বধুশয্যা ছেড়ে যাওয়া গেরিলার বুকে,
মাইনফিল্ডে ফেঁসে যাওয়া
দেশপ্রেমিক মুক্তিসেনার বুকে।

পিতৃ হত্যার প্রতিবাদে আমি রুষে উঠি
আমি শ্রাবণ ধারায় বর্ষি না,
দিবস কেন্দ্রিকতার উর্ধ্বাকাশে বসে।
অশ্রæপাত নয় অশ্রæদ্রোহ করি
পিতৃহন্তারকের নশ্বর অবিনশ্বরকে,
ঘৃনা দ্রোহের অগ্নিতে জ্বালি।

ফ্লোরেন্স সিটি, ইটালী
বুধবার রাত্রি ১১:৪৫মিঃ
১৪ আগস্ট ২০১৯ইং
———————————
মনে পরে নন্দিনী

তোমার স্মৃতির প্রচ্ছদপটে
জমেছে কালো মেঘের ছায়া,
তোমার বিশ্বাসের স্তম্ভ নড়বড়ে,
হতাশা যখন তোমার মসৃণ হৃদয় প্রাঙ্গণে।
বেদনার ফাউন্ডেশন গড়েছে
যখন তুমি অন্ধকারে সর্বত্রই,
তান্ডব নৃত্য দেখেছো
তখনি কেবল একজন তোমাকে ভালোবেসেছে।
এক সমুদ্র ভালোবাসার তরঙ্গে দুলেছে
আমার ভালোবাসাটা সসীম,
যেমন, নিরাকার ব্র²ের প্রতি কর্তব্যপরায়ণ পুরোহিতের,
প্রাতে ও সন্ধ্যে নিয়মানুবর্তিতার পূজার্চনা।
যাহা কেবল হৃদয়ঙ্গম করলেই বোঝা যাবে
গর্ভবতী নারীর প্রসব বেদনা
বিজ্ঞান কিংবা আধ্যাত্মিক ত্বত্তে¡,
বিশ্লেষণ করা যাবেনা ঠিক যেমন মন দিয়ে মনকে ছোঁয়া।
নন্দিনী,
তোমার অনুপস্থিতি কাল বোশেখীর,
প্রচন্ড ছোবলে এলোমেলো করে তুলেছে
জীবনের স্বপ্নের সিঁড়িগুলো,
জৈষ্ঠ্যের দ্বি-প্রহরে রোদ-বৃষ্টির মিলন তিথির বিরহ রোদন।
আমাকে নিরন্তর অনুরাগী করে তুলে
যদিও আষাঢ় শ্রাবণ চাষের কাজে,
তবুও আমি ব্যস্ত শ্রাবন সন্ধ্যায় শ্রাবণ কাব্যের সান্ধ্যরাগে
শিউলি মালতি কামিনী বাগে রই।
ভাদ্র-আশ্বিন দুর্গাপূজা
বাজে ঢোল তাক ধিনা ধীন,
ঝুমুর বাজে ঝুম ঝুম ঝুম
কার্তিকের নবান্নের দেশে।
অগ্রায়হনের শিল্পময় ফসলের মাঠে,
আমারই এ হাতে কাস্তে দিয়েছো তুলি
পৌষালী সন্ধ্যে তোমার কাশ্মীরী শালটি জড়িয়ে,
মাঘীহেম চন্দ্রালোকে বিচরণশীল।
ফাগুন রঙে রাঙানো দোলে
দোল খেতে খেতে কখন যে চৈতী বায়ে,
তোমার লঁলাটের এলোকেশে হাত রেখেছি!
চৈত্র্যসংক্রান্তির ঝড়ো সন্ধ্যে, সেই যে চলে গেলে।
অতঃপর বাইশ বছর পেরিয়ে
চৈত্র্যসংক্রান্তির ঝড়ো সন্ধ্যের স্থানটিতে দাঁড়িয়ে,
সেই যে একা আমি
এখনো তোমার চলে যাবার পথ পানে চেয়ে থাকি।

ফ্লোরেন্স সিটি ইটালী
শনিবার বিকেল
১৭ আগস্ট ২০১৯ইং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

etiler escort taksim escort beşiktaş escort escort beylikdüzü