আইন-অপরাধজাতীয়

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে এসি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে ১৮ জনের মৃত্যু

টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : নারায়ণগঞ্জের তল্লা বায়তুল সালাহ জামে মসজিদে গত শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে এসি বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৯ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তবে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডাক্তার পার্থ শঙ্কর পাল এ তথ্য জানিয়েছেন। এ ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিস একটি, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ একটি ও জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
জানা গেছে, গত শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা এলাকার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে এসি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ফরজ নামাজের মোনাজাত শেষে অনেকে সুন্নত ও অন্য নামাজ পড়ছিলেন। এসময় মসজিদের ভেতরে প্রায় ৪০ জনের মতো মুসল্লি ছিলেন। বিস্ফোরণে মুহূর্তের মধ্যে মসজিদের ভেতরে থাকা প্রায় ৪০ জনের মধ্যে সবাই দগ্ধ হন। হুড়াহুড়ি করে বের হওয়ার চেষ্টা করেন তারা। তাদের মধ্যে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় ৩৭ জনকে উদ্ধার করে শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। এসি বিস্ফোরণে দগ্ধ ৩৭ জনের মধ্যে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তিরা হচ্ছে, মো. বাহাউদ্দীন (৫৫), রিফাত (১৮), মোস্তফা কামাল (৩৪), জুবায়ের (১৮), সাব্বির (২১), কুদ্দুস ব্যাপারী (৭২), হুমায়ুন কবির (৭০), ইব্রাহিম (৪৩), মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন (৪৮), জুনায়েদ (১৭), জামাল (৪০), জুবায়ের (৭), রাশেদ (৩৪), রাসেল (৩৪), মো. নয়ন (২৭) ও কাঞ্চন হাওলাদার (৫৩)। বাকি ২ জনের নাম এখনও জানা যায়নি।
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, গত শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে এশার নামাজের জামাত শেষ হওয়ার পর তল্লার সবুজবাগের বাইতুস সালাত জামে মসজিদে এসির বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে মসজিদে সুন্নত নামাজ আদায়রত ৩৭ জন সবাই দগ্ধ হন। গুরুতর দগ্ধদের সবাইকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। তাদের শরীরের ৩০ থেকে ৯৫ ভাগ পুড়ে গেছে।
শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে মোট ৩৭ জন রোগী ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩৭ জনের মধ্যে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাকি ১৯ জন ভর্তি আছেন তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। তাদেরকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়েছে। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্তÍ ১২টি মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল আরেফিন জানান, প্রাথমিকভাবে এসি নয় গ্যাসলাইন থেকে মসজিদে বিস্ফোরণ ঘটেছে। গত শুক্রবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এ কথা জানান তিনি। তিনি আরো জানান, মসজিদটির নিচ দিয়ে গ্যাসের পাইপলাইন নেওয়া হয়েছে। সেই পাইপে ছিদ্র হয়ে গ্যাস নির্গত হচ্ছিল। পুরো মসজিদ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় সব জানালা বন্ধ ছিল। এ কারণে গ্যাস বাইরে বের হতে পারেনি। ওই অবস্থায় কেউ মসজিদের ভেতরে এসি বা ফ্যানের সুইচ বন্ধ করার সময় সৃষ্ট ছোট্ট স্ফূলিঙ্গ থেকেই আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে মসজিদের ভেতরে আগুন ধরে যায় ও মুসল্লিরা দগ্ধ হন। আগুনে মসজিদের ৬টি এসিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খবর পেয়ে নারায়ণগঞ্জের হাজীগঞ্জ ও মণ্ডলপাড়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভায়। পরে মসজিদের মেঝেতে পানি ছিটিয়ে গ্যাস নির্গত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। এ ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিস একটি, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ একটি ও জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
অপরদিকে, গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকেই গ্যাস জমে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তিতাস কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে ভয়াবহ এ বিস্ফোরণ হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের। মসজিদ কমিটির অভিযোগ, ৯ মাস আগেই গ্যাসলাইনের লিকেজ মেরামতের জন্য লিখিতভাবে অভিযোগ জানানো হলেও ৫০ হাজার টাকার জন্য কাজ করেনি তিতাস।
মসজিদ কমিটির সভাপতি আব্দুল গফুর মেম্বার বলেন, গ্যাসলাইন লিকেজ হওয়ার বিষয়টি টের পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তা মেরামত করার জন্য তিতাসকে জানিয়েছিলাম। তখন তারা আমাদের কাছে ৫০ হাজার টাকা চেয়েছিল। আমরা টাকাটা জোগাড় করতে পারিনি বলে আর মেরামত করা হয়নি।
এদিকে মসজিদে বিস্ফোরণের পর গতকাল শনিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী মোহাম্মদ আল মামুন। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত চলছে, কেউ দায়ী হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিতাসের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ঘটনায় যদি কেউ দায়ী থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গ্যাসলাইনের লিকেজ ধরেই তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক ও তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব নূর হাসান। তিনি বলেন, আমরা আলামত সংগ্রহ করছি। প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে আমরা কথা বলছি। গ্যাস লিকেজ এবং বিদ্যুৎতের বিষয় মাথায় রেখেই আমরা তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছি।
এদিকে, মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বলে মানতে নারাজ নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি একেএম শামীম ওসমান। তিনি বলেন, বিস্ফোরণের ঘটনাটি নাশকতা কি-না তা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তদন্ত করে দেখতে হবে। গতকাল শনিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার পশ্চিম তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদ পরিদর্শনে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
শামীম ওসমান আরো বলেন, মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় নাশকতার আশঙ্কা করছি। কারণ গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে গ্যাস জমে বিস্ফোরণে ৪৫ জন মানুষ পুড়ে যাবে, এটি সম্ভব না। এসি আমাদের অনেকের বাড়িতে আছে। এসি বিস্ফোরণ হলে বাইর থেকে হবে। কারণ এসির গ্যাস চেম্বার বাইরে থাকে। এখানে গ্যাস সংযোগ দেখলাম গেটের সামনে। ওটা দিয়ে গ্যাস ভেতরে ঢুকবে না। এখানে খোলা বাতাস, গ্যাস সেটির সঙ্গে বেরিয়ে যাবে। ভেতরে যদি কিছু থাকে সেটি বের করার দায়িত্ব তদন্ত কর্মকর্তার। এখন প্রশ্ন হলো স্পার্ক করলে কে? মসজিদে আগুনটা জ্বালাল কে? এতগুলো মানুষ একসঙ্গে পুড়ে গেল কীভাবে? তবে এসি বিস্ফোরণে একসঙ্গে এতগুলো মানুষ পুড়ে যাওয়া অসম্ভব।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। যারা মারা গেছেন এবং যাচ্ছেন, আহত হয়েছেন তাদের জন্য একটা কিছুর ব্যবস্থা করা হবে। এগুলো ধাপে ধাপে করা যাবে। কিন্তু মানুষের জীবন তো ফিরিয়ে আনা যাবে না। যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তারা শহীদের দরজা পেয়ে গেছেন। কিন্তু যারা আহত তার পরিবারের যে শোক, এটা যার গেছে একমাত্র সেই বুঝতে পারছেন। আমাদের যায়নি তাই আমরা বুঝতে পারব না। আমি দেশবাসীর কাছে অনুরোধ করব যারা হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন তাদের জন্য দোয়া করবেন।
শামীম ওসমান বলেন, প্লাস্টিক, রাসায়নিক বা এই জাতীয় ঘটনা তদন্তে যারা অভিজ্ঞ তাদের এ ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হোক। ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিজ্ঞ কারা সেটা সরকার নির্ধারণ করবে। তবে আমি মনে করি ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা দরকার। কারণ এসির বিস্ফোরণ তো বাইর থেকে হওয়ার কথা, মসজিদের ভেতরে হলো কীভাবে?
স্থানীয় সূত্র জানায়, বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণে গতকাল শনিবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত শিশুসহ ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একসঙ্গে এতগুলো মানুষ মারা যাওয়ায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাদের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই সঙ্গে শনিবার এলাকার সব দেকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। নিহতদের মরদেহ গ্রহণ করেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদা বারিক। জানাজা শেষে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করবেন ইউএনও।
এদিকে নিহতদের পরিবারকে নগদ ২০ হাজার টাকা করে অনুদান দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. জসিম উদ্দিন।

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

mersin escort mut escort mersin escort canlı tv izle konya escort
sakarya escort sakarya escort sakarya escort sakarya escort sakarya escort
sakarya escort sakarya escort ümraniye escort serdivan escort
ankara escort ankara escort bayan escort ankara
Balıkesir escort Manisa escort Aydın escort Muğla escort Maraş escort Yozgat escort Tekirdağ escort Isparta escort Afyon escort Giresun escort Çanakkale escort Trabzon escort Çorum escort Erzurum escort Zonguldak escort Sivas escort Düzce escort Tokat escort Osmaniye escort Didim escort Kütahya escort Mardin escort Van escort Yalova escort Şanlıurfa escort Ordu escort Alanya escort Fethiye escort Sakarya escort Konya escort Elazığ escort Kayseri escort Hatay escort Diyarbakır escort Kocaeli escort Gaziantep escort Adana escort Van mutlu son Maraş mutlu son Şanlıurfa mutlu son Isparta mutlu son Amasya mutlu son Afyon mutlu son Denizli mutlu son Kayseri mutlu son Eskişehir mutlu son Tekirdağ mutlu son Adana mutlu son Çanakkale mutlu son Kayseri mutlu son Denizli mutlu son Tokat mutlu son Yalova mutlu son Sivas mutlu son Kırklareli mutlu son Osmaniye mutlu son Mardin mutlu son Zonguldak mutlu son