জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা গ্রেফতার

টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা : করোনাভাইরাস পরীক্ষায় টেস্ট না করেই রিপোর্ট ডেলিভারি দেয়া জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রোববার দুপুরে তাকে তেজগাঁও বিভাগীয় উপ-পুলিশ (ডিসি) কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে গ্রেফতার করে। জেকেজি হেলথ কেয়ারের প্রতারণার অভিযোগে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আরিফ চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সাবরিনা তারই স্ত্রী। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, তদন্তে জেকেজির প্রতারণার সঙ্গে ডা. সাবরিনা আরিফের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এর আগে রোববার দুপুর সোয়া ১টায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন জেকেজির প্রতারণা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, ডিসিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। দুই ঘণ্টা পর বিকেল সোয়া ৩টার দিকে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
ডা. সাবরিনা জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক। তিনি গণমাধ্যমে নিজেকে জেকেজির ‘চেয়ারম্যান নয়’ বরং প্রতিষ্ঠানটির ‘কোভিড-১৯ বিষয়ক পরামর্শক’ দাবি করেছেন। তবে পুলিশের তদন্ত বলছে, সাবরিনাই জেকেজির চেয়ারম্যান।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে সাবরিনা কী বলেছেন, তা জানা না গেলেও শনিবার একটি বেসরকারি চ্যানেলকে সাক্ষাৎকার দেন তিনি। সেখানে সাবরিনা দাবি করেন, আমার জেকেজির চেয়ারম্যান হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। বরং এটা ওভাল কোম্পানির একটি অঙ্গ সংগঠন। ওভাল গ্রুপ ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। যেখানকার মালিক হচ্ছেন আরিফুর রহমান। তিনি আরও দাবি করেন, জেকেজির বিষয়ে আমি ডিজি স্যারকে (স্বাস্থ্য অধিদফতরের আবুল কালাম আজাদ) বলেছি, এডিজিকে বলেছি।
এর আগে গত ৪ জুন স্বামী আরিফুলের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ তুলে সাবরিনা তেজগাঁও বিভাগের একটি থানায় সাধারণ ডায়রি (জিডি) করেন। চলতি বছরের মে মাসে স্বামী আরিফের সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে গণমাধ্যমে দাবি করেছেন সাবরিনা।
সম্প্রতি সরকারের কাছ থেকে বিনামূল্যে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি নিয়ে অর্থ নিচ্ছিল জেকেজি। পাশাপাশি নমুনা পরীক্ষা ছাড়াই ভুয়া সনদ দেয়ার অভিযোগে গত ২৩ জুন ভোরে
তানজীন পাটোয়ারী নামে এক নার্স ও তার স্বামী গ্রাফিকস ডিজাইনার হুমায়ুন কবীর হিরুকে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে জেকেজির প্রতারণার রহস্য। ওইদিন দুপুরে জেকেজির গুলশানের অফিসে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয় ডা. সাবরিনার স্বামী আরিফ চৌধুরীসহ ৬ জনকে। পরে আরিফ চৌধুরীকে ছাড়িয়ে নিতে তার ক্যাডার বাহিনী তেজগাঁও থানায় গিয়ে ভাংচুরের চেষ্টা করে। এসব ঘটনায় পুলিশ ৪টি মামলা করেছে।
পুলিশ জানতে পারে, জেকেজি হেলথকেয়ার থেকে ২৭ হাজার রোগীকে করোনার টেস্টের রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৫৪০ জনের করোনার নমুনা আইইডিসিআরের মাধ্যমে সঠিক পরীক্ষা করানো হয়েছিল। বাকি ১৫ হাজার ৪৬০ জনের রিপোর্ট প্রতিষ্ঠানটির ল্যাপটপে তৈরি করা হয়। জব্দ করা ল্যাপটপে এর প্রমাণ মিলেছে। আরিফ চৌধুরী জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানান, জেকেজির সাত-আট কর্মী ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করেন।
সূত্র জানায়, জেকেজির মাঠকর্মীরা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে করোনা উপসর্গ দেখা দেয়া মানুষের নমুনা সংগ্রহ করতেন। প্রতি রিপোর্টে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা নেয়া হতো। এছাড়াও নমুনা সংগ্রহের জন্য জেকেজির হটলাইন নম্বরে ফোন করলে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বাসায় গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করতেন। আবার অনেকে জেকেজির বুথে এসে নমুনা দিতেন। বিদেশি নাগরিকদের জন্য নেয়া হতো ১০০ ডলার (প্রায় ৮ হাজার ৫০০ টাকা)। বাংলাদেশিদের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা। সেই হিসাবে করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্টে প্রায় ৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জেকেজি। যদিও দাতব্যপ্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতির ভিত্তিতে বিনামূল্যে তাদের স্যাম্পল কালেকশন করার কথা ছিল। এসব ঘটনার পর ২৪ জুন জেকেজি হেলথকেয়ারের নমুনা সংগ্রহের যে অনুমোদন ছিল তা বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
পুলিশ জানিয়েছে, ডা. সাবরিনা জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক। পাশাপাশি তিনি জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান। আর তার স্বামী আরিফ চৌধুরী প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
অপর একটি সূত্র জানায়, করোনা ভাইরাসের টেস্ট না করেই ভুয়া রিপোর্ট সরবরাহ করে টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় স্বামী আরিফ চৌধুরী গ্রেফতার হলেও দায় এড়াতে নানা ফন্দি আটকে ছিল জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা। নিজেকে রক্ষায় প্রভাবশালী বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন তিনি। চিকিৎসকদের একটি প্রভাবশালী সংগঠনের এক প্রভাবশালী নেতার বান্ধবী হওয়ায় অনেকেই মনে করেন ডা. সাবরিনা দায় থেকে রেহাই পেয়ে যাবেন। তবে পুলিশ বলছে, তদন্ত চলছে। দোষী যেই হোক ছাড় পাবে না।
জানা গেছে, স্বামী গ্রেফতার হওয়ার পর ডা. সাবরিনা নিজেকে রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠেন। জেকেজির সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা নেই প্রমাণ করতে ২৪ জুন ভোর সোয়া পাঁচটায় নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দেন। এতে তিনি লেখেন, অনেক আশা নিয়েই জেকেজি হেলথকেয়ার শুরু করেছিলাম বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য। কোনো জিনিস প্রতিষ্ঠা করাই বড্ড কঠিন! অনেক কষ্ট করেছি। করোনা বিপর্যয় শুরু হওয়ার পর প্রথম এলাকাভিত্তিক স্যাম্পল কালেকশন শুরু হয়-কত মানুষের কত রকম বাধা। কোনো দোকান খোলা নেই, জিনিসপত্র নেই, কেউ ভয়ে করোনা নিয়ে কাজ করতে চায় না। সব পেরিয়ে পথ চলা। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই আমাকে সরে আসতে হয়। যারা আমাকে কাছ থেকে চেনেন তারা জানেন, আদর্শ আর ভালোবাসার কনফ্লিক্টে আমি সব সময় আদর্শকেই বেছে নিয়েছি। ৪-৬ তারিখেই স্বাস্থ্য অধিদফতর আর ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার ল্যাবের অধ্যাপক তুষার স্যার এবং আমার কাছে যে কজন সাংবাদিক ভাই ও বোনের নম্বর ছিল তাদের জানিয়ে আমি সরে যাই এখান থেকে।
আমি চলে গেছি মানে এই নয় যে, এখানের কোনো সমস্যায় আমি পুলকিত হবো বা তা আমাকে ছোঁবে না। যদি কেউ দোষ করে থাকে তার প্রমাণ সাপেক্ষে অবশ্যই সাজা হবে। হওয়াই উচিত। তবে আমার প্রশ্ন হল, দু’একজন কর্মচারীর নামে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একটা প্রতিষ্ঠান যে এতদিন ধরে সেবা দিয়ে গেছে সব মুহূর্তেই মিথ্যা হয়ে যাবে?
আমার বেশির ভাগ এফবি ফ্রেন্ড আমার জন্য উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন, ভরসা দিয়েছেন- তাদের প্রতি কৃতজ্ঞত্যা। যারা চিরকালই আমার দোষ বের করতে পেরে বিমল আনন্দ পেয়েছেন তাদের জন্য এই পোস্ট নয়…।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে প্রতারক আরিফকে জানিয়েছেন, ডা. সাবরিনা জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান। নিজেকে রক্ষা করতে সাবরিনা এমন চতুরতার আশ্রয় নিতে পারেন।
সাবরিনার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা জানতে চাইলে অধিদফতরের মুখপাত্র ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, এ বিষয়ে আমার জানা নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

etiler escort taksim escort beşiktaş escort escort beylikdüzü