জনস্বাস্থ্য সচেতনতাই করোনার প্রধান প্রতিষেধক

আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ্ঃ প্রথমত করোনা ভাইরাস/কোভিড ১৯ ঝুকি এড়াতে এবং নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসাবে বিশ্বের প্রায় ৩৩টির বেশি দেশে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১৫/৩০ দিন বা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি রাষ্ট্রে সকল অঞ্চলে এবং ১৭টি রাষ্ট্রের বিশেষ কিছু অঞ্চলের সকল প্রকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। সকল প্রকার জনসমাবেশ, মিছিল, মেলা, শোভাযাত্রা, সেমিনার বন্ধ করতে বা এড়িয়ে চলতে বলা হচ্ছে। সকল প্রকার ভীড়ের কেন্দ্র স্থলসমূহ থেকে জনসাধারণকে নিরাপদ দূরুত্ব বজায় চলার এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের অপ্রয়োজনে বাসার বাইরে না যাবার প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

বিশ্বের অনেক দেশ তার দেশে সারা বিশ্বের জন্য বা বিশেষ অঞ্চলের কিছু দেশের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা এবং বিমান চলাচল সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ/সীমিত করে দিয়েছে। প্রতিটি দেশে কোন বিদেশী লোক আসলে অথবা তার নিজ দেশের বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের থার্মাল স্কেনার মেশিন দিয়ে চেক করা হচ্ছে করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের সনাক্ত করার জন্য। তাদের মধ্যে করোনা আক্রান্তদের দ্রুত আলাদাভাবে চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অন্যদের সাধারণ নিয়ম অনুসারে ১৫ দিনের জন্য কোয়ারান্টাইন সেন্টারে পাঠিয়ে এবং রেখে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সৌদি আরব উমরা হজ্জ ভিসা প্রদান বন্ধ রেখেছে। জাতিসংঘ করোনা ভাইরাসকে মহামারী হিসাবে ঘোষনা করেছে। আমাদের বাংলাদেশও এর কোন ব্যতিক্রম না। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ৮ জন করোনা আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে, তাদের চিকিৎসা চলছে।

কিন্তু তাই বলে এরূপ এক উদ্ভূত বিশ্ব পরিস্থিতিতে দেশের স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিগুলো খোলা রাখার ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে একটি ভুল বার্তা এবং বড় ধরনের অসতর্কতা। তাই অতি স্বত্ত্বর প্রাথমিক পর্যায়ে প্রথমে ১৫ দিনের জন্য এবং প্রয়োজন বোধে পরবর্তী আরো ১৫ দিনের জন্য সকল প্রকার স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হবার ঝুকি কমাবার কৌশল নিতে হবে। বয়স্কদের অপ্রয়োজনে বাইরে গমনাগমন সীমিত করতে হবে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশু-ছোটদের নিয়ে অপ্রয়োজনে বাসার বাইরে যাওয়া এবং লোকালয়ে বেড়ানো এড়িয়ে চলা উচিত।

জনসাধারণকে মুখে মাস্ক লাগিয়ে চলাচল করা, অর্থ/পণ্য লেনদেন/ক্রয়- বিক্রয়ের কাজে নিযুক্ত ব্যক্তিদের হাতে গ্লাভস লাগিয়ে কাজ করা এবং বাইরে যাবার আগে বা বাইরে থেকে ফিরে ভাল করে হাত, মুখ, পা ধুয়ে জীবাণুনাশক কাপড় কাচার সাবান দিয়ে ধোয়া, হেক্সিসন, সেপনিল দিয়ে নেয়া, বিভিন্ন স্থান স্যাবলন, ডেটল পানি দিয়ে ধোয়া। প্রচুর পানি পান করতে হবে। নিয়মিত ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন; লেবু, কমলা, পেয়ারা, আমলকী, স্ট্রবেরী, পালং শাক, ক্যাপসিক্যাম খেতে হবে। করোনা প্রতিরোধে যথেষ্ঠ ব্যবস্থা আছে, করা হচ্ছে, এখনো দেশ-জাতি করোনার প্রকোপ থেকে যথেষ্ঠ নিরাপদ এইসব ভেবে এবং বলে আত্নতুষ্টিতে ভোগার কোন অবকাশ নেই।

কারণ জাতিসংঘের হিসাব মতে, সারা বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রায় এক লাখ ত্রিশ হাজার লোক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার লোক মারা গেছে, ৬৫ হাজার লোক ভাল হয়ে বাড়ি ফিরেছে এবং বাকীদের চিকিৎসা চলছে। হয়ত করোনায় আরো মানুষ আক্রান্ত হবে, ভুগবে, মারা যাবে এবং করোনা মাস দুয়েক স্থায়ী হবে। তাই করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এখনি আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ শুরু করতে হবে যে পর্যন্ত না করোনা ভাইরাসের প্রকোপ এবং আতংক থেকে বিশ্ব এবং বাংলাদেশ পুরোপুরি ঝুকিমুক্ত এবং নিরাপদ হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, দেশে গত বছর ২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে লাখো মানুষ আক্রান্ত হয়ে ভুগেছে এবং তিন শতকের বেশি মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে। লাখো মানুষ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চরম কষ্ট-দুর্ভোগ সহ্য করেছে। সারা বিশ্বে প্রায় ৩ হাজার মানুষ সেল্ফি তুলতে গিয়ে মারা গেছে। এছাড়া প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকান্ড, সন্ত্রাস, অপরাধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার, এইডস, কিডনী ড্যামেজ, লিবার সিরোসিস, রক্ত শূণ্যতার মত নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশে- বিদেশে লাখ লাখ মানুষ ভুগছে এবং মারা যাচ্ছে। সম্প্রতি অনেক স্থানে এডিস মশার লার্ভার সন্ধান পাওয়া গেছে।

তাই অদূর ভবিষ্যতে পুনরায় এডিস মশার বিস্তার ঘটে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই অতি দ্রুত দেশব্যাপী সর্বাত্নক মশক নিধন অভিযান শুরু করার এবং এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধ করে দেশবাসীকে ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে বাঁচানোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত।
তাই এতসব সমস্যা, বিপদ, আতংকের কথা সব কিছু ভুলে শুধু এক করোনা ভাইরাসের কথা-চিন্তা নিয়ে দিন-রাত পড়ে থাকলে তো চলবে না। এখন সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশের মানুষও করোনা নামক এক অদৃশ্য মৃত্যু দানব ভাইরাসের করাল ছোবলের ভয়ে আড়ষ্ট, ভীত, শংকিত।

আর এই সুযোগে দেশের একশ্রেণির নিকৃষ্ট ব্যবসায়ী মানুষের এই অসহায়ত্ব, ভয়, প্রয়োজনকে হাতিয়ার বানিয়ে ব্যবসা করার ফন্দিফিকির করছে। অথচ এর বিপরীতে অনেকে দেশে অনেক ঔষধ ব্যবসায়ী ব্যক্তিগত উদ্যেগে জনসাধারণের মধ্যে বিনা মূল্যে মাস্ক বিতরণ করছে সে দৃশ্য, খবর আমরা দেখছি, শুনছি। এদের বিবেক জাগ্রত হওয়া উচিত। এই বিপদকালে যদি আমরা সারা দেশবাসী এখনই একজোট হয়ে জনস্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করি তাহলে দশের লাঠি একের বোঝার মত এবং দশে মিশে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজের মত ব্যাপার হবে।

তৃতীয়ত সারা বিশ্বের আলোচিত এবং আতংক করোনা ভাইরাস অন্যান্য সব রোগের মতই এক প্রকার ঠান্ডা-সর্দি জ্বর। যা মূলত ঠান্ডা প্রধান অঞ্চল বা পরিবেশে এর প্রকোপ, বিস্তার বেশি। অপরদিকে গরম প্রধান অঞ্চল বা পরিবেশে তুলনামূলকভাবে এর প্রকোপ, বিস্তার কম।
জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস অ্যাঢানম গেব্রেইসাস সাংবাদিকদের বলেছেন, “এখন রোগটির একটি নতুন নাম রয়েছে আমাদের কাছে। সেটি হলো কোভিড-১৯।” এটি ‘করোনাভাইরাস ডিজিজ ২০১৯-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এই কোভিড ২০১৯-এরই আরেক নাম নোভেল করোনা ভাইরাস।

এর পূর্বে সার্স নামক যে রোগের কথা শুনা গিয়েছিল এবং বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেটিও ছিল একপ্রকার করোনা ভাইরাস। এটি মূলত সাত প্রকার। করোনা ভাইরাসেরই একটি নতুন ভয়ঙ্কর রূপ। শ্বাস কষ্ট জনিত সংক্রামক ব্যধি। যা মানব দেহে প্রথমে শ্বাসনালীতে প্রদাহ সৃষ্টি করে শুকনো কাশি, শ্বাস কষ্ট সৃষ্টি করে এবং রোগীর হাঁচিকাশির মাধ্যমে সংক্রামক ব্যধি ছড়ায়। করোনা হলেই যে কেউ মারা যাবে এমন কোন ব্যাপার নয়। তারপরও একথা বাস্তব যে, করোনা ভাইরাস তামাম দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভাইরাস হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।

করোনা ভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হলে তাকে নিয়ে অযথা আতংকিত না হয়ে বরং তাকে হাসপাতালে নিয়ে যথাযত চিকিৎসা দেয়ার দ্রুত ব্যবস্থা করতে হবে। তাই করোনার প্রকোপে আশা হত না হয়ে, অযথা মৃত্যুর আতংকে না ভুগে বরং নিজে স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে, থেকে অন্যদের স্বাস্থ্য সচেতন হবার, থাকার ব্যবস্থা করার উপর গুরুত্ব দেয়া উচিত।
মানব জন্মের স্বাভাবিক পরিণতি অসুখ, ব্যাধি, মৃত্য। সুতরাং করোনা নিয়ে অযথা মাত্রাতিরিক্ত চিন্তা করার, অস্থির হবার, ভয় পাবার, আতংকিত হবার কিছু নেই। আপাতত যেহেতু এর কোন প্রতিষেধক নেই; তাই জনসাধারণের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রচার চালিয়ে, জনমত সৃষ্টি করে, সুনির্দিষ্ট কিছু কৌশল গ্রহন এবং বাস্তবায়ন করে সম্ভাব্য করোনার ভয়াল ছোবল এবং কবল থেকে ঝুকি মুক্ত এবং নিরাপদ থাকার পদক্ষেপ নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

তাই করোনা প্রতিরোধের জন্য সরকারী কোষাগারে টাকা মজুদ না রেখে বরং এখনই ১/ মাঠ পর্যায়ে জনসাধারণের মধ্যে শীতকালে দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে শীতবস্ত্র প্রদান এবং বন্যা/জলচ্ছ্বাসে দুর্গত মানুষের মধ্যে রিলিফ বিতরণের ন্যায় বিনা মূল্যে মাস্ক, হেন্ড গ্লাভস, ডেটল, হেক্সিসন, সেপনিলের মত জীবানু ধবংসকারী দ্রব্যাদি প্রদান করার কার্যক্রম শুরু করা। ২/ সিটি কর্পোরেশানগুলোর অধীনে রাস্তাঘাট, অলিগলি, ড্রেন, সুয়ারেজ, ডাসবিন, প্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়িতে জীবাণুনাশক ঔষুধ ছিটানোর অভিযান শুরু করা। আর এজন্য সশ্রস্ত্র বাহিনীর লজিস্টিক সাপোর্ট নেয়া অপরিহার্য। সকলের সমবেত প্রচেষ্টায় এদেশ এবং জাতি করোনা ভাইরাসের প্রকোপ থেকে নিরাপদ, মুক্ত থাকবে এবং করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে বিজয়ী হবে ইনশাল্লাহ।
asifultasin18@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

etiler escort taksim escort beşiktaş escort escort beylikdüzü