ইসলাম ধর্মে নির্দেশিত পশু কোরবানীর ইতিকথা

আশিফুল ইসলাম জিন্নাহ্ : যরত ইব্রাহীম আ. তার প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল আ. -কে স্বপ্নে দেখা তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর নামে কোরবানী করার হুকুমের দিলে পুত্র ইসমাইল আ.-এর সম্মতি সাপেক্ষে নির্জন স্থানে নিয়ে পুত্র ইসমাইলের অনুরোধে তার হাত-পা-চোখ বাঁধার পর ইব্রাহীম আ. নিজে চোখ বন্ধ করে পুত্র ইসমাইলের গলায় ছুড়ি চালিয়ে তাকে কোরবানী দেন এবং এরপর ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় চোখ খুলে দেখেন ইসমাইল আ.-এর শোয়ানোর স্থলে একটি সাদা দুম্বা জবাই অবস্থায় পাথরের উপর পড়ে আছে। এর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে পিতা-পুত্র তাদের ঈমানী পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণহন। এই অবিস্মরণীয় ঘটনাকে চির স্মরণীয় রাখতে, আল্লাহর প্রতি মুসলমানদের আনুগত্যের প্রতীক স্বরূপ, আর্থ-সামাজিকভাবে স্বচ্ছল ও ধনীদের মধ্যে তাদের নিজেদের মনের পশু প্রবৃত্তিকে জবাই দেয়ার মর্মার্থ বুঝাতে প্রতি বছর সারা বিশ্বের হাজীরা জিলকাদ হজ্জের দিন এবং বিশ্বের সকল দেশের সাধারণ মুসলমানরা ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে পশু কোরবানী করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আল্লাহর নামে। এভাবে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম আ. কর্তৃক তার প্রাণপ্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল আ.-কে আল্লাহর রাহে কোরবানী দেয়ার ঘটনা স্মরণে মুসলিম উম্মাহ বিগত ১৪ শতাব্দী/১৪০০ শত বছরের অধিককাল ধরে পশু কোরবানী দিয়ে আসছে। কোরবানীর জন্য ছয় ধরনের গৃহপালিত পশুর কথা জানা যায়। উট, দুম্বা, ভেড়া, ছাগল, গরু, মহিষ। এই পশু কোরবানী হজ্জ এবং ঈদুল আজহার দিন থেকে তৃতীয় দিন পর্যন্ত দেয়া যায়।

নিজেদের নিত্যদিনের খাদ্যের চাহিদার সহজ যোগান দিতে এবং শারীরিক শক্তি পূরণ করতে মানুষ আদিকাল থেকে বিভিন্ন পশু-পাখি-মাছ শিকার ও হত্যা করে তার মাংস খেয়ে আসছে। বর্তমানেও বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের নিত্যদিনের খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন পশু-পাখি- মাছের মাংস ও ডিম ব্যবহার করে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন ধর্মের, বর্ণের জনগোষ্ঠী, আদিবাসীরা তাদের নিজ নিজ ধর্মের ও সমাজের নির্দেশানুযায়ী এবং প্রচলিত ঐতিহ্যগত প্রথা অনুসারে বিভিন্ন পদ্ধতিতে পশুপাখি হত্যা করে তার মাংস ভক্ষণ করে। আর কোন পশুপাখি- মাছের মাংস খেতে হলে তাকে কোন না কোন পন্থায় হত্যা/বধ করতে হবে। সেক্ষেত্রে ইসলাম অনুমোদিত পশুপাখির গলা কেটে জবাইয়ের মাধ্যমে প্রাণী হত্যার প্রথা সবচেয়ে উত্তম নিরাপদ স্বাস্থ্যসম্মত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসাবে স্বীকৃত। সেই হিসেবে মুসলমানরা কোরবানীর পশুকে কিছু নিয়মকানুন মেনে গলায় ধারালো ছুড়ি চালিয়ে জবেহ পদ্ধতিতে হত্যা করে কোরবানী সম্পন্ন করে। অন্যান্য সাধারণ সময়েও তারা এই জবেহ পদ্ধতিই অনুসরণ করে। এতে করে পশুর শরীর ও মাংস থেকে দূষিত রক্ত ও রক্তের মাধ্যমে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অধিকাংশ ব্যাক্টেরিয়াই বের/নিঃসরিত হয়ে যায় আপনা থেকে। এছাড়া ইসলামে শিশু জন্মের পর তার মঙ্গলার্থে পশু জবেহর মাধ্যমে আকিদা করার প্রথা আছে। তাই ইসলামে জবেহর মাধ্যমে হজ্জ, ঈদুল আজহার পশু কোরবানী এবং নবজন্ম শিশুর নামকরণের জন্য পশু জবেহর মাধ্যমে আকিদা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত।

আদিকাল থেকে পশু, পাখি, মাছ, সরীসৃপসহ বিভিন্ন প্রাণীর মাংস মানুষের প্রাত্যাহিক খাবার তালিকার এক অনিবার্য অংশ। আদিকাল থেকে মানুষ পারিবারিকভাবে খাবারের জন্য, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব ও অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে বিভিন্ন পশুপাখি, মাছ, পোকা, সরীসৃপ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় পদ্ধতিতে হত্যা করে থাকে। এতে করে পৃথিবী ও প্রকৃতিতে পশু, পাখি, মাছের সংখ্যা প্রাকৃতিকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকছে এবং ভারসাম্য রক্ষিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে ধনী ও সচ্ছল মুসলমানরা হজ্ব, ঈদুল আজহার দিন গৃহপালিত পশু দিয়ে বা গৃহস্থের বাড়ি বা পশুর হাট থেকে হাসিল দিয়ে পশু ক্রয় করে শরিয়া মোতাবেক পশু কোরবানী করা এবং তার গোস্ত মুসলমানদের মধ্যে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বন্টন করে খাওয়া, দান করা ইসলাম ধর্মের এক আবশ্যকীয় ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব ও ব্যবস্থাপনা। বিশ্বে মুসলমানদের কোরবানী সম্পর্কে ভারতের জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রখ্যাত অধ্যাপক বিকাশ রাওয়াল তার এক গবেষণায় বলেছেন, “বছরে ৩ কোটি ৭০ লাখ গরু-মহিষ জন্ম হয়। জবাই বন্ধ হলে এদের খাবারের পেছনে বছরে ৫.৪ লক্ষ কোটি টাকা খরচ হবে। যা অর্থনীতি উন্নয়নের চাকাকে অনেকটা পিছিয়ে নেবে৷ এ ছাড়াও মুসলমান জাতি পশু কোরবানি না করলে ১০ বছর পর-(ক) পশুর খাদ্য ও বাসস্থান সংকট দেখা দিবে। (খ) মানুষের আয় কমে যাবে। (গ) মানুষের খাদ্য সংকট দেখা দিবে এবং (ঘ) মানুষের রোগ বালাই বেড়ে যাবে।

সারা বিশ্বের সাধারণ মুসলমানরা কোরবানী পশুর মাংসকে তিনভাগে বন্টন করে থাকে নিজেদের খাবারের জন্য, আত্নীয়-প্রতিবেশীদের এবং গরীব- মিসকিনদের দেয়ার জন্য। ইসলামে কোরবানী পশুর গোস্ত বন্টনের ব্যাপারে সমহারে ৩ ভাগ করার বিধান আছে। তবে কেউ চাইলে তার কোরবানীকৃত পশুর সমস্ত মাংসই নিজের পরিবারের খাওয়ার জন্য সংরক্ষণ করতে পারে। এতে কোন বিধিনিষেধ নেই। এভাবে কোরবানী পশুর মাংস বন্টন দ্বারা সামাজিক ভাতৃত্ববোধ সুদৃয় হয় এবং যে সকল গরীব- মিসকিন সারা বছর গোস্ত কিনে খেতে পারে না তারা কোরবানীর সময় গোস্ত খাওয়ার একটা সুযোগ পায়। অনেকে আবার তাদের কাছে সংরক্ষিত অধিক মাংস কম দামে খোলা বাজারে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে তারা তাদের অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র (কাপড়, সেন্ডেল, বাসন- গ্লাস) কিনতে পারে। শহর-গ্রামের দরিদ্র কৃষক, পশু পালনকারীরা পশু বিক্রি, বাৎসরিক ব্যবসা করে টাকা কামাতে পারে বা চাষাবাদ/দোকানী ব্যবসা/ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার করার/বই কেনার জন্য, বিভিন্ন কাজের জন্য মূলধনের টাকা পায়। গরু/পশু ব্যবসায়ী, কামার, মজুররা বড়- ছোট ছুড়ি, চাপাতি, বটি, খড়, ঘাস, পাটি, দড়ি, বাঁশ, পরিবহন ব্যবসায়ী, সরকার, হাটের ইজারাদার এবং তাদের সহযোগীরা নানাভাবে লাভবান হয়। কোরবানির পশুর বিপুল পরিমান চামড়া দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে৷ এগুলোর বিক্রিত টাকা দিয়ে মসজিদ, মাদ্রাসা, দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো নানাভাবে উপকৃত হয়। কোরবানী উপলক্ষ্যে দেশের গরিব দুস্থ মানুষ গরু জবাই, গোস্ত কাটা ও বর্জ পরিষ্কার করে হলেও কিছু টাকা উপার্জন করে।

যাকাত, হজ্জ্ব, পশু কোরবানী সামর্থ্যবান মুসলমানদের প্রতি আল্লাহতায়ালার হুকুম৷ যাকাত ও হজ্জ্ব ফরজ। আর হজ্জ্ব পালনকারীদের জন্য পশু কোরবানী হজ্জ্বের বিভিন্ন আবশ্যকীয় ধর্মীয় সম্পন্ন কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। এছাড়া সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য ঈদুল আজহায় পশু কোরবানী আল্লাহতায়ালা হুকুম; যা ওয়াজিব। পশু কোরবানির উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, মনের পশুত্বকে দূরীভূত করা, মুসলিম উম্মার আত্নশক্তির উদ্বোধন করা এবং মুসলমানদের মধ্যে সামাজিক ভাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করা। তার মানে কোরবানী ইসলামের অন্যতম একটি শি’আর বা ঐতিহ্যগত নিদর্শন, কুরবানীকে যারা পশু হত্যাযজ্ঞের মহোৎসব বলে তারা ইসলাম ও মুসলমানদের দুশমন। মুসলমানদের জন্য আল্লাহর হুকুমই সর্বশেষ কথা। পশু কোরবানীর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শহর ও গ্রামের ক্ষুদ্র চাষী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী ধনীক, সচ্ছল শ্রেণির মানুষের পশু কেনা, কোরবানী থেকে বিভিন্ন দিক থেকে আর্থ-সামাজিকভাবে উপকৃত হয় এবং পশুর সংখ্যা প্রাকৃতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এজন্যই আমাদের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি এবং বাঙালী মুসলিম রেনেসার কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার বিখ্যাত ‘কোরবানী’ কবিতায় হজ্জের দিন এবং ঈদুল আজহায় মুসলমানদের পশু কোরবানীর ব্যাপারে লিখেছেন, “ওরে হত্যা নয়, শক্তির উদ্বোধন”। ভাল লাগলে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করুন।
asifultasin18@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

etiler escort taksim escort beşiktaş escort escort beylikdüzü