আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস

জিয়াউদ্দীন চৌধুরী (জেড সেলিম), বিশেষ প্রতিনিধি, টাইমস ২৪ ডটনেট, ঢাকা: আজ সারা বিশ্বে যখন মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হচ্ছে, তখন বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যমের ওপর চাপ ও ভয়ভীতি আমাদের যারপরনাই উদ্বিগ্ন করে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণ করে এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জরিপ এবং মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে সারা বিশ্বেই গণমাধ্যমের ঝুঁকি বেড়ে চলেছে। আর যেসব দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে, তার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।

১৯৯১ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ অধিবেশনের সুপারিশ মোতাবেক ফ্রিডম ডে’ অথবা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের স্বীকৃতি দেয়া হয়। সেই থেকে হস্তক্ষেপ প্রতিহত করার শপথ গ্রহণ এবং পেশাগত দায়িত্ব ১৯৯৩ সালে প্রতি বছর সারা বিশ্বে ব্যাপক ডামাডোলের সাথে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল্যায়ন, স্বাধীনতায় জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ৩ মে তারিখটিকে ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস পালনকালে ক্ষতিগ্রস্ত ও জীবনদানকারী সাংবাদিকদের স্মরণ ও তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয় এই দিবসটিতে।

এ বছর মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২৪ বছরে পা দিল। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই ২৪ বছরে গণমাধ্যম মানুষের কাছে যেমনি আরো জনপ্রিয়, পরিচিত এবং আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে, তেমনি গণ মাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে নানা সমালোচনা; দায়িত্বশীলতা নিয়ে নানামত, সর্বপোরী গণমাধ্যম কর্মী ও সাংবাদিকদের জীবনও আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের দেশে দেশে দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেই চলেছে। নানাভাবে গণমাধ্যম কর্মী হচ্ছে লাঞ্ছিত এবং নিগৃহীত। নিরাপত্তার অভাবে গণমাধ্যম হয়ে পড়ছে কোনঠাসা; আর শাসক-কর্তাদের রক্তচক্ষু, আমলাদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র এবং দুনীতিবাজ ও চেরাকারবারীরা গণমাধ্যম কর্মীদের দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। জরিপে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ এবং ১৪ সালে পৃথিবীতে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় ১০৫ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছে; আর গত এক দশকে প্রায় ৭শ’ সাংবাদিক নিহত হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থাও তেমনি। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে গত চার দশকের কিছু বেশি সময়ে সাড়ে ৬ শ’ সাংবাদিক হত্যার কিংবা বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছেন । আমাদের দেশে সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় কিংবা গৃহে স্বস্ত্রীক খুন হওয়ার পরেও অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদেরকে খুঁজে পায়না রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োজিত সংস্থাগুলো।

আমাদের দেশে সাংবিধানিকভাবে ১৯৭৬ সালের আদেশ নম্বর ৩ মোতাবেক ৩৮ ধারার উপধারা (১) ও (২) এ/বি-তে স্পষ্টভাবে, ‘প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা, বিবেকের স্বাধীনতা এবং কথা বলার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে’। একটি মুক্ত ও সভ্য সমাজে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। তাত্ত্বিকভাবে রাষ্ট্রের আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের পরেই চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদমাধ্যম তথা গণমাধ্যমের স্থান নির্ধারিত হলেও এই ‘চতুর্থ স্তম্ভ ব্যতিরেকে বর্তমান যুগে অন্য তিনটি স্তম্ভকে সক্রিয় বা কার্যকর করার প্রয়াস একটি অকল্পনীয় এবং অসম্ভব ব্যাপার। রাষ্ট্রীয় জীবনে সংবাদমাধ্যমের এই অসীম গুরুত্ব ও অপরিসীম ভূমিকার কারণেই প্রেসিডেন্ট জেফারসন বলেছিলেন, ‘‘যদি আমাকে বলা হয় কোনটা বেছে নেব সংবাদক্ষেত্র ছাড়া সরকার, না সরকার ছাড়া সংবাদক্ষেত্র? আমি বেছে নেব শেষেরটিকে।”

পারিপার্শ্বিক জীবন ও জগৎ সম্পর্কে জানার স্বাধীনতা নিয়েই মানুষ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে। জন্মগতভাবেই মানুষ চিন্তা-চেতনা ও বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগের অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছে। তাই বলা যায় প্রত্যেক মানুষ জন্মসূত্রেই তথ্যজগতে প্রবেশ করার অসীম যোগ্যতা অর্জন করে রেখেছে। জানার এই অসীম যোগ্যতা থাকলেও যুগে যুগে মানুষ জানতে গিয়ে এবং জানাতে গিয়ে নানা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছে। যুগে যগেই চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা শাসকগোষ্ঠী অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে। সত্য কথা বলার দয়ে বহু গুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা কঠোর শাস্তিরও সম্মুখীন হয়েছেন; কিন্তু জানা ও জানানোর ইচ্ছা ও চেষ্টাকে কেউ কোনোদিন অবদমন করতে পারেনি। জানার স্বাধীনতা মানুষের এমন এক স্বাধীনতা যা দমন করা যায়ও না। তাইতো মুক্তভাবে জানার ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমরা ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে বিশ্বখ্যাত ইংরেজ কবি মিল্টনকে লড়াই করতে দেখি। কবির ভাষায়: ‘‘দাও আমায় জ্ঞানের স্বাধীনতা দাও, কথা কইবার স্বাধীনতা দাও, মুক্তভাবে বিতর্ক করার স্বাধীনতা দাও। সবার ওপরে আমাকে দাও মুক্তি।’’ কবি মিল্টন তার বিখ্যাত গ্রন্থ অ্যারিও প্যাজিটিকায় আরও বলেছেন ‘‘মানুষের জানার স্বাধীনতা, বলার স্বাধীনতা, বিবেকের তাড়নায় স্বাধীনভাবে নিজের মতের পক্ষে যুক্তি প্রদানের স্বাধীনতা, অন্য যেকোনো স্বাধীনতার চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে।”জাতরি পতিা বঙ্গবন্ধু শখে মুজবিুর রহমান বলছেলিনে, ‘নেশনন মাস্ট বি ইউনাইটডে অ্যাগইেনস্ট করাপশন। পাবলকি ওপনিয়িন মবলিাইজ না করলে শুধু আইন দিয়ে করাপশন বন্ধ করা যাবে না।’ গণসচতেনতা তৈরিতে মডিয়িার ভূমকিা বঙ্গবন্ধুর আমল থকেইে গুরুত্বরে সঙ্গে স্বীকৃত।

একসময় গণমাধ্যম কে সম্প্রচার মাধ্যম বলা হতো।সময়ের সাথে সাথে মানুষের বিবেক বোধ জাগ্রত হয়ে এর নাম হয়েছে গণমাধ্যম বা Mass media যদিও প্রেস বলতেই আমরা গণমাধ্যম বুঝে থাকি। আসলে গণমাধ্যম হচ্ছে সংগৃহীত সকল ধরণের মাধ্যম, যা প্রযুক্তিগতভাবে গণযোগাযোগ কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সম্প্রচার মাধ্যম যা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া নামে পরিচিত, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে তাদের তথ্যাবলী প্রেরণ করে। টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, রেডিও বা বেতার, সিডি, ডিভিডি এবং অন্যান্য সুবিধাজনক ছোট ও সহায়ক যন্ত্রপাতি যেমনঃ ক্যামেরা বা ভিডিওচিত্রের সাহায্যে ধারণ করা হয়। পাশাপাশি মুদ্রিত মাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্র, সাময়িকী, ব্রোশিওর, নিউজলেটার, বই, লিফলেট ও পাম্পলেটে বাহ্য বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়। এতে ফটোগ্রাফী বা স্থিরচিত্রও দৃশ্যমান উপস্থাপনায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বেতার বা টেলিভিশন কেন্দ্র অথবা পাবলিশিং কোম্পানী গণমাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত হয়ে সংগঠনরূপে আধুনিক প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করে থাকে। এ ছাড়া মোবাইল বা সেল ফোন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, সামাজিক সাইট ফেসবুক, টুইটার বিশেষ করে ব্লগ এবং ওয়েব পোর্টালগুলো এখনকার সবচেয়ে আলোচিত গণমাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

গণমাধ্যম হচ্ছে জাতির কণ্ঠস্বর, একে অবারিতভাবে চলতে দিলে জাতি যেমন উন্নত হয়, তেমনি গণতন্ত্রু হয় মজবুত এবং শক্তিশালী। একটি দেশের মানুষ কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করছে তা যদি কেউ পরিমাপ করতে চায় তবে সেই দেশের গণমাধ্যম কতটুকু স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে । কেননা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মধ্যেই নাগরিকের অধিকার লুকায়িত । দেশের মানুষের স্বাধীনতা ভোগের প্রতিচ্ছবি গণমাধ্যমের মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগের নিশ্চয়তা প্রদান করা অপরিহার্য। বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতেই ইতোমধ্যে তথ্য অধিকার আইন এবং সম্প্রচার মাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। আমরা আশা করি এর ধারাবাহিকতায় এ দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আরো সম্প্রসারিত হবে। পাশপাশি গণমাধ্যম কর্মীরাও নিজেদের দায়িত্বশীলতার কথা মাথায় রেখে সঠিক সমালোচনা এবং প্রকৃত তথ্য উপস্থানে সচেষ্ট হবেন।পরিশেষে বলতে চাই বাংলাদেশে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে’র আলোচনায় সাংবাদিকের নিরাপত্তার দিকে বেশি আলোকপাত করা হয়, কিন্তু অন্য অনেক ক্ষেত্র যেগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে বাধাগ্রস্ত করে কিংবা যে যে ক্ষেত্রে সে স্বাধীনভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেই বিষয়গুলোও আলোচনায় আসা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *